তীব্র তাপদাহেও কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল, শতকোটি টাকার বাণিজ্য

22
cox's bazar

তীব্র তাপদাহের মধ্যেই পবিত্র ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখ মিলে ৬ দিনের টানা ছুটিতে পর্যটকের ঢল নামে কক্সবাজারে। তবে, ছুটির প্রথম দুইদিন উল্লেখ করার মতো ভ্রমণপিয়াসী না এলেও বাকি তিনদিন প্রায় পাঁচ শতাধিক হোটেল মোটেল এবং গেস্ট হাউসগুলো শতভাগ বুকিং ছিল। লোকে লোকারণ্য ছিলো বেলাভূমি ও পর্যটনের সকল অনুষঙ্গ। এতে আবাসনসহ পর্যটন সেবার সকল খাত মিলিয়ে দৈনিক ৩০-৩৫ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। রমজানে দীর্ঘ খরার পর, ঈদ পরবর্তী তিনদিনে শতকোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

Advertisement

এদিকে তারকা হোটেল ছাড়া গেস্ট হাউস, কটেজ বা নরমাল হোটেলগুলো বরাবরের মতোই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছে বলে অভিযোগ ছিল পর্যটকদের। এসব আবাসন সেবা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের দাবি, রমজানে পর্যটক খরার পর পাঁচ দিনের ছুটি থাকলেও আবাসনে ব্যবসা মিলেছে মাত্র তিন দিন।

অপরদিকে এপ্রিলের রুদ্রমূর্তি ধারণ করা সময়ে ছুটিতে শুরু হওয়া নববর্ষ বরণ উপলক্ষে পহেলা বৈশাখ পূর্বের ধারায় এবারও তিনদিনের জমকালো আয়োজনে বৈশাখী মেলা করছে পর্যটন জোনের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। পার্কিং এলাকায় নাগরদোলা, লবিতে বৈশাখ ঐতিহ্যের মেলার নানা স্টল বসানো, বৈশাখী আলপনায় সাজানো হয়েছে হোটেলের পার্কিং এলাকাসহ চারপাশ। বিনোদনে হোটেল অতিথিদের সন্তানদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিস্কুট ও বেলুন লজেন্স সংগ্রহ, নারী অতিথিদের বালিশ বদল, পুরুষদের মুখ দিয়ে চকোলেট সংগ্রহের খেলাসহ ছিল জলের গান শিল্পী গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সবার জন্য উন্মুক্ত এসব নানা আয়োজন পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ যোগীয়েছে।

খেলায় অংশ নিয়ে প্রথম হওয়া বগুড়ার পর্যটক সামশুল আলম বলেন, পরিবার নিয়ে ঈদের ছুটি কাটাতে কক্সবাজার এসেছি। তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস এত চমৎকারভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে জানা ছিল না। এসি চলা লবিতে পুরো গ্রামীণ ঐতিহ্য ফুটিয়ে তিন দিনের মেলা হোটেলে থাকা অতিথিদের বাড়তি আনন্দ যোগোচ্ছে।

ছুটিতে বাড়তি পর্যটক উপস্থিতি মাথায় রেখে নিরাপত্তায় সর্বদা সচেষ্ট ছিল ট্যুরিস্ট ও জেলা পুলিশ। ঈদের সময়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত দুটি স্পেশাল ট্রেন চালু করায় কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। রেলে আসা অধিকাংশ পর্যটক কক্সবাজার এসেই হোটেল দেখে বুকিং দিয়েছে।

ট্যুরস অপারেটর এসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সভাপতি তোফায়েল আহমেদ বলেন, পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস ছাড়াও রেস্তোঁরা, ওয়াটার ও বিচ বাইক, কিটকট, শামুক-ঝিনুক, শুটকি, বার্মিজ পণ্য বিক্রিসহ কয়েক লাখ মানুষ সরাসরি পর্যটন সেবা সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। পর্যটক সমাগম বাড়লে তাদের আয়ের পথও সুগম হয়।

হোটেল স্যান্ডি বিচ ও রেস্তোরাঁর পরিচালক আবদুর রহমান বলেন, এবার আগাম বুকিংয়ের চেয়ে ওয়ার্কিং পর্যটক এসেছে উল্লেখ করার মতো। এসেছেন কক্সবাজারের আশপাশের জেলা-উপজেলার ভ্রমণপিয়াসীও। যারা বিকালে এসে রাতে ফিরেছেন। তাই আবাসন সংকট হয়নি। হোটেল-মার্কেটের ব্যবসায়ী ও হকারেরা এ কয়েকদিন ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে।

কক্সবাজার হোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, একটা সময় পর্যটকরা বুকিং দিয়ে কক্সবাজারে আসতো। ট্রেন চালু হওয়ার পর হতে কক্সবাজার পৌঁছে হোটেলের রুম দেখে বুকিং দিচ্ছে। এবারে ঈদের পরদিন থেকে পর্যটক আসে কক্সবাজারে। ১২, ১৩ ও ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ভালোই ব্যবসা হয়েছে। কিন্তু ১৫ এপ্রিল থেকে আবারও ভাটা নেমেছে।

কক্সবাজার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম ডালিম বলেন, পর্যটন সংশ্লিষ্টদের আয়-ব্যয় সমান্তরাল। দুদিনের ব্যবসায় এখানে টিকে থাকা কষ্টকর। এভাবে বছর পার করা সম্ভব নয়। তারপরও বিনিয়োগ রয়েছে যখন, হঠাৎ সবগুটিয়ে চলে যাওয়াও অসম্ভব। রমজান জুড়ে লসটি ঈদের তিনদিনে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে।

কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলকারী ব্যবসায়ী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ঈদে আবহাওয়া বৈরী ছিল না। এ সময়টাতে সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ পেলে আরও বেশি পর্যটক আসতো কক্সবাজারে। বাড়তো আয়ও।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউসে ২৫ হাজারের মতো কক্ষ রয়েছে। সে হিসেবে একদিনে আবাসন থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৯-১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া পরিবহণ রেস্তোঁরা ও অন্য পর্যটন অনুষঙ্গের সেবা মূল্য এসেছে ২০-২৫ কোটি টাকার মতো। এ হিসেবে ঈদ-নববর্ষের ছুটিতে শতকোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুধু মাত্র বিচ্ছিন্ন কয়েক দিবসে নয়, সৈকতকে ঘিরে কক্সবাজারকে সুপুরিকল্পিতভাবে সাজানো গেলে বছর জুড়েই পর্যটক সমাগম সমান্তরাল থাকতে এখানকার রাজস্ব আয়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি আসতো।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আপেল মাহমুদ বলেন, ঈদের ছুটিতে ব্যাপক পর্যটক সমাগমের কথা মাথায় রেখে সব ধরণের প্রস্তুতি ছিল আমাদের। সৈকতে পর্যটকদের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করেছি আমরা। বিপদাপন্ন পর্যটকরা একটি বাটন টিপেই সেবা নিশ্চিতের ব্যবস্থা নেওয়া ছিল। পর্যটকের নিরাপত্তা ও সেবায় সার্বক্ষণিক টহল রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. ইয়ামিন হোসেন জানান, হোটেলে-মোটেল ও রেস্তোরাঁয় অতিরিক্ত টাকা আদায় কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে হয়রানি রদ এবং পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে ছিল। ঈদের এ তিনদিনে পর্যটকদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ পায়নি।

Advertisement