চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে কেন এই দুর্ভোগ

266

এখন পর্যটনের মওসুম। ভ্রমণপিপাসু মানুষ এই সময়টির জন্য বিশেষভাবে অপেক্ষা করে থাকেন। প্রকৃতি-পরিবেশ ও আবহাওয়া অত্যন্ত অনুকূল ও মনোরম থাকায় যে কোনো সুযোগ-অবকাশে তারা বেরিয়ে পড়েন পছন্দের পর্যটনস্থল পরিদর্শনে। গত প্রায় এক বছর করোনাকারণে ঘরবন্দি থাকায় মানুষ অনেকটাই অতীষ্ট। তাদের মনে প্রতিনিয়তই গুঞ্জরিত হয়েছে: ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগতটারে’। এখন তাই অনেকেই পর্যটনে মাতোয়ারা। চাইলেই বেরিয়ে পড়া যায় বটে; কিন্তু সমস্যা হলো যাতায়াত সুবিধা মোটেই সহজ ও মসৃন নয়। পথে-ঘাটে নানা সমস্যা ও সংকট। পথের ঝামেলা ও দুর্ভোগ মোকাবিলা করতে গিয়ে ভ্রমণের আনন্দটাই মাটি হয়ে যায়। পর্যটনে নৌ, রেল, বিমান ও সড়কপথ ব্যবহারের সুবিধা থাকলেও সড়কপথের প্রাধান্য অস্বীকার করা যায় না।

Advertisement

যাতায়াত ও পর্যটনে সড়কনির্ভরতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু সড়কের অবস্থা সারাদেশেই এতটাই নাজুক ও বিশৃংখল যে, নির্ধারিত সময়ে স্বাচ্ছন্দ্যে ও আরামে কোথাও যাওয়া বা আসা অসম্ভব। প্রায় প্রতিটি সড়কই ভেঙ্গেচুরে একাকার। কোনো সড়কই অবৈধ দখল থেকে মুক্ত নয়। সড়কের পরিসরও নয় এক বরাবর। এরপর রয়েছে বিশৃংখল যান চলাচল। দ্রুতগতির ভারী বাস-ট্রাকের পাশাপাশি হালকা থি হুইলাব, ব্যাটারিচালিত নসিমন, করিমন, ভটভটি ইত্যাদি চলছে। যানজট নিত্য ও অবধারিত দৃশ্য। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি প্রতিদিনের বাস্তবতা। এমতাবস্থায়, যাতায়াত ও ভ্রমণ যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ও বিড়ম্বনাকর, সহজেই অনুমান করা যায়। বলার অপেক্ষা রাখেনা, কক্সবাজার পর্যটন বা ভ্রমণের জন্য এক নম্বর আকর্ষণীয় স্থান। দেশে এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে, যে বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত এবং পাহাড়-জঙ্গলে ভরা চিত্তহারী কক্সবাজার দেখার আশা পোষণ না করে। বিদেশী পর্র্যটকদেরও বাংলাদেশে প্রধান আকর্ষণ সাগরের বিশাল পটভূমিতে কক্সবাজার দর্শন। দু:খজনক হলেও বলতে হচ্ছে, পর্যটননগরী কক্সবাজারে যাতায়াতের জন্য চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কই প্রধান ভরসা। বিমান চলাচলের ব্যবস্থা আছে, তবে দেশের পর্যটকদের বেশিরভাগের পক্ষে আর্থিক ও অন্যান্য কারণে বিমানভ্রমণের সুযোগ নেয়া সম্ভব হয় না। কক্সবাজারের সঙ্গে রেল যোগাযোগ নেই। নৌপথে বাইরের দেশগুলো থেকে এখানে আসার ব্যবস্থা কিছুটা থাকলেও দেশের ভেতর থেকে আসা বা যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক দেশের অন্যান্য সড়ক-মহাসড়কের চেয়ে মোটেই আলাদা নয়। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর অবস্থা অধিক শোচনীয়। এই মহাসড়কে ম্যানেজমেন্ট বলতে কিছু আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। সড়কের বিভিন্ন এলাকা খানাখন্দকে ভরা। সড়ক দখল করে অনেক বাজার গড়ে উঠেছে। আছে অবৈধ স্থাপনা। যান চলাচলের অবস্থা হযবরল। সিএনজি, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, টমটম ইত্যাদি দিব্যি চলছে। যানজটের তো কথাই নেই। ১৫০ কিলোমিটারের এই মহাসড়ক পাড়ি দিতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পার হয়ে যায়। দুর্ঘটনাও ঘটতে দেখা যায় প্রায়ই। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা দলে দলে কক্সবাজার আসছেন। কিন্তু এই মহাসড়কে এসেই তারা মহাবিড়ম্বনা ও অশেষ দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের ভ্রমণেচ্ছা এই মহাসড়কেই নি:শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের অবৈধ যানবাহনের সড়ক দখল, বাজার ও অবৈধ স্থাপনার কারণে প্রতিদিনই পর্যটকবাহী শত শত যানবাহন আটকা পড়ছে। কর্ণফুলী সেতু থেকে এ দুর্ভোগের শুরু। সেতু থেকে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে।

মহাসড়কের শিকলবাহা থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত সরু। এ অংশে রয়েছে ১০টি বাঁক। পটিয়া থেকে বাংলাবাজার পর্যন্ত এলাকায় রয়েছে অন্তত ২০টি বাজার। এই যদি একটি মহাসড়কের হাল-অবস্থা হয় তবে কস্মিনকালেও যাতায়াত সহজ, স্বাভাবিক ও মসৃণ হতে পারেনা। মহাসড়কটির এই সার্বিক চিত্র সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের অজানা থাকার কথা নয়। তারপরও তারা।

প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়নি কেন, সেটাই প্রশ্ন। এটা মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চরম ব্যর্থতা বলেই প্রতিপন্ন হবে। যেহেতু কক্সবাজারে যাতায়াতের জন্য এই মহাসড়কটিই প্রধান অবলম্বন, সুতরাং এর দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করা উচিৎ ছিল। মহাসড়কটির পরিসর বাড়ানো, বাঁক মোচন, দখল উচ্ছেদ, সংস্কার, এবং যানচলাচলে শৃংখলা এনে যানজট রহিত করা মোটেই কঠিন কাজ নয়। যথোচিত উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিলেই এটা সম্ভব হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে তার গতি অত্যন্ত মন্থর। মহাসড়কের ৩২ কিলোমিটার অংশ সম্প্রসারণ ও বাঁক সোজাকরণের প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। কবে সেই প্রকল্প গৃহীত ও বাস্তবায়িত হবে, সেটা ভবিতব্যই জানে।

কক্সবাজার সম্পর্কে অনেক পরিকল্পনার কথাই শোনা যায়। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হবে, কক্সবাজারের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ হবে, কক্সবাজরে গভীর সমুদ্রবন্দর হবে, কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে শিল্প-বাণিজ্যের হাব ইত্যাদি। কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলেছে বছরের পর বছর ধরে। কবে শেষ হবে, কেউ বলতে পারে না। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সম্প্রসারণের কথা অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছে। এ সংক্রান্ত প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। তবে এর জমি অধিগ্রহণই এখনো শেষ হয়নি। গভীর সমুদ্র বন্দর কিংবা শিল্প বাণিজ্যের হাব, সেও দূরের বাঁশীর রাগিনী। পরিকল্পনার কল্পনা বিস্তৃত করে জনগণকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা বা তাদের মধ্যে স্বপ্ন কাতরতা সৃষ্টি করা রাজনৈতিক চাতুর্যের মধ্যে পড়ে। এর ফল ইতিবাচক হয় না। ভবিষ্যতের মাস্টারপ্লান দেখিয়ে বর্তমানকে অবহেলা করা কখনো সঙ্গত ও উচিৎ হতে পারে না। কবে কখন কি হবে, সেটা বলার চেয়ে এখন কি করতে হবে, সেটাই করা উচিৎ। আমরা আশা করবো, চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন এবং তার পরিচালন ব্যবস্থাপনার উৎকর্ষ সাধনে ত্বরিৎ ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Advertisement