ওবাইদুল আকবর রুবেল, ফটিকছড়ি প্রতিনিধিঃ মানুষের সেবাকেই জীবনের একমাত্র ব্রত বানিয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ, আঘাত আর অপূর্ণতাকে শক্তিতে রূপ দিয়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জনপ্রিয় নারী জনপ্রতিনিধি ফিরোজা বেগম।
৫৮ ছুঁইছুঁই বয়সের এই নারী আজও প্রতিদিন মানুষের সমস্যার কথা শোনেন, সমাধানের চেষ্টা করেন। কোনো সরকারি অফিসে নয়, অনেক সময় ভাইয়ের দোকানের ছোট্ট অফিসেই বসে এলাকার মানুষের অভিযোগ, দুঃখ-কষ্ট আর প্রয়োজনের কথা শোনেন তিনি। রাত পর্যন্ত চলে মানুষের জন্য তার এই নিরলস ব্যস্ততা। ফিরোজা বেগমের জীবনের গল্পটা সহজ নয়। কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময়ই বিয়ে হয় তার। কিন্তু নানা কারণে সেই সংসার টেকেনি। জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা নিয়ে তিনি ফিরে আসেন বাপের বাড়িতে। অনেকের জীবন যেখানে থেমে যায়, সেখান থেকেই যেন নতুন পথ খুঁজে পান তিনি। ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করে সিদ্ধান্ত নেন—নিজেকে বিলিয়ে দেবেন মানুষের সেবায়। দরিদ্রতা ও সংগ্রামকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাই তাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা দিয়েছে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সাবেক ধুরুং ইউনিয়ন (বর্তমান ফটিকছড়ি পৌরসভা) এলাকার নূর আহমদ সুফি বাড়ির মৃত রশিদ আহমদ সওদাগর ও রশিদা খাতুন দম্পতির মেয়ে ফিরোজা বেগম। ১৯৮৭ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরে চাকরি নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। প্রথমে একটি মাতৃকেন্দ্রের সম্পাদক এবং পরে মাঠকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মানুষের কাছাকাছি কাজ করতে করতেই তার মনে জন্ম নেয় নতুন এক ভাবনা—বৃহত্তর পরিসরে মানুষের সেবা করতে হলে জনপ্রতিনিধি হওয়া প্রয়োজন। এরপর ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত নারী সদস্য পদ চালু হলে এলাকার মানুষের অনুরোধে ধুরুং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হন তিনি। ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে ‘গোলাপ ফুল’ প্রতীক নিয়ে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। সেই শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। চারবার ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত সদস্য এবং পরে ফটিকছড়ি পৌরসভার ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে টানা তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। বর্তমানে একই ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তিনি ফটিকছড়ি পৌরসভার তৃতীয়বারের মতো প্যানেল মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ধুরুং কে এম টেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সভাপতি, আনোয়ার আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সদস্য, উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সাবেক সদস্য, থানা মহিলা মেম্বার সমিতির সাবেক আহ্বায়ক, উপজেলা হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সদস্য এবং উপজেলা নারী উন্নয়ন ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’ কার্যক্রমের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে জয়িতা সম্মাননা পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে পেয়েছেন নানা সম্মাননা।
ফিরোজা বেগমের ভাই মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, “আপা কখনো মানুষের সেবাকে অবহেলা করেননি। দুর্যোগে-দুর্বিপাকে সবার আগে ছুটে যান তিনি। এলাকার মানুষের খোঁজখবর নেন, সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন। আমাদের পুরো পরিবারকেও তিনি মানুষের সেবার কাজে যুক্ত করে রেখেছেন।”
তবে পথটা একেবারে মসৃণ ছিল না। সমাজসেবা ও জনপ্রতিনিধিত্বের দীর্ঘ যাত্রায় তাকে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। স্কুটি চালিয়ে এলাকা ঘুরে রাস্তা-ঘাটের কাজ দেখা কিংবা মানুষের খোঁজ নিতে গিয়ে শুনতে হয়েছে কটু কথা, সহ্য করতে হয়েছে তাচ্ছিল্য। রক্ষণশীল সমাজের নানা সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।
কিন্তু কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারেনি। পরিবারের সমর্থন আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে তিনি এগিয়ে গেছেন মানুষের সেবার পথেই।
ব্যক্তিগত সংসারজীবন গড়ে তোলার কথা কেন আর ভাবেননি—এমন প্রশ্নের উত্তরে ফিরোজা বেগম বলেন, তার অনুপ্রেরণার উৎস দুই বিশ্বখ্যাত মানবতাবাদী নারী—মাদার তেরেসা এবং প্রিন্স ডায়ানা।
তিনি বলেন, “তাদের জীবন থেকে অনুপ্রেরণা পাই। মানুষের জন্য কিছু করতে পারার মধ্যে যে আত্মতৃপ্তি আছে, তা অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। যতদিন বেঁচে আছি, মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চাই।” ব্যক্তিগত জীবনের কষ্টকে শক্তিতে রূপ দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে উদাহরণ ফিরোজা বেগম তৈরি করেছেন, তা ফটিকছড়ির মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।

















