‘গাড়ি চলে না চলে না’ গানে মানবশরীর ও জীবনের অনিশ্চয়তার কথাই তুলে ধরেছিলেন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম। কিন্তু সেই গানের লাইন এখন বাস্তব হয়ে উঠছে রেলপথেও। লোকোশেড থেকে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ফিট সনদ নিয়েই যাত্রা শুরু করে ট্রেনের ইঞ্জিন। যাকে ট্রেনের পরিভাষায় লোকোমোটিভ বলা হয়।
এখন মাঝপথে একের পর এক ইঞ্জিন বিকল হচ্ছে। এতে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না যাত্রীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথেই পার হচ্ছে তাদের। গত এক বছর চার মাসে ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের কারণে বিলম্ব হয়েছে মোট ৭৯১ ঘণ্টা। দিনের হিসাবে যা ৩৩ দিন। এসব ইঞ্জিন বিগড়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে মেয়াদ। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও চালানো হয় জোড়াতালি দিয়ে। পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৪০টির মধ্যে ১০৫টিরই। এমন পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহায় বাড়ি ফেরা মানুষের চাপের মধ্যে আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেছেন, ‘ইঞ্জিনসংকট ও বিকল হওয়ার সমস্যা আছে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি, সেটি যেন যাত্রীসেবায় প্রভাব না পড়ে। নতুন ইঞ্জিন কেনার একটা প্রক্রিয়া চলছে। সেটা হলে হয়তো সংকট আর থাকবে না।’
কর্মকর্তারা বলছেন, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে প্রয়োজনের তুলনায় ইঞ্জিন আছে অর্ধেক। সচল ইঞ্জিনের মধ্যে ৭৫ শতাংশের মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ইঞ্জিনের বয়স ৭৩ বছর। কোনোটির আবার ৫০ বছর। এসব বুড়ো ইঞ্জিন জোড়াতালি দিয়ে চলছে ট্রেন। ফলে পথে পথে বিকল হয়ে বাড়ছে যাত্রী ভোগান্তি।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইঞ্জিন বিকলের হার ছিল বেশি। গত জানুয়ারিতে ২১টি ইঞ্জিন বিকল হলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫টিতে। মার্চ মাসে এ সংখ্যা আরও বেড়ে ২৭টিতে পৌঁছায়। এপ্রিল মাসেও পথে পথে ২৮টি ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ১৬ মাসে (২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত) ইঞ্জিন বিকল হয়েছে ২৭৯ বার। এতে ট্রেন বিলম্ব হয় ৭৯১ ঘণ্টা।
সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে আন্তঃনগর ট্রেন। রেলের আয়ের প্রধান উৎস এসব যাত্রীবাহী ট্রেন। ২১টি ইঞ্জিন বিকল হওয়ার মধ্যে গত জানুয়ারি মাসে ১২টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৫, মার্চে ১৩ ও এপ্রিলে ১৪টি ঘটনাই ছিল আন্তঃনগর ট্রেনের। বিশেষ করে তিস্তা এক্সপ্রেস, উপকূল এক্সপ্রেস এবং ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের মতো জনপ্রিয় ট্রেনগুলো বারবার বিকল হচ্ছে। মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোও পিছিয়ে নেই, ফেব্রুয়ারিতে এমন আটটি ট্রেনের ইঞ্জিন মাঝপথে বিকল হয়েছিল।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের ঢাকা বিভাগে ইঞ্জিন বিকলের প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঢাকা-ময়মনসিংহ-জামালপুর এবং ঢাকা-সিলেট রুটে। বিশেষ করে টঙ্গী-ভৈরববাজার-আখাউড়া এবং জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ সেকশনে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। কারণ, এ বিভাগে চলাচলরত ট্রেনের ইঞ্জিনগুলো পুরনো সিরিজের, যার বয়স ৪৮ থেকে ৫৭ বছর।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসতে দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন কবি ও কথাসাহিত্যিক সৈকত দে। বললেন, ‘অনলাইনে চট্টলা এক্সপ্রেসের এসি সিটের টিকিট কাটি। ট্রেন ছাড়ার কথা দুপুর সোয়া ২টায়। ছাড়ে প্রায় বিকাল ৪টার দিকে। চট্টগ্রাম পৌঁছানোর কথা রাত সাড়ে ৮টায়। পৌঁছায় রাত ১১টায়। সুবর্ণ ও তূর্ণা নিশীথার মতো সমমূল্যের এসি সিট হলেও আসন ছিল কাঠের। এখানে প্রচুর লোক দাঁড়িয়ে ছিল। ওপর থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছিল। এসির তাপমাত্রাও ঠিক ছিল না। কখনো গরমে সিদ্ধ হচ্ছিলাম। কখনো আবার বেশি ঠান্ডা। টয়লেটগুলো খুবই নোংরা। ট্রেনে বিক্রি করা খাবারের মান খুবই নিম্নমানের। পথে পথে তৃতীয় লিঙ্গ ও ভিক্ষুকদের উৎপাত তো ছিলই। হকারও ছিল প্রচুর। এমন দুর্বিষহ ট্রেন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি।’
বিকল হওয়ার পেছনে বড় কারণ পুরনো ইঞ্জিন। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ইঞ্জিন আছে ১৪০টি। এর মধ্যে সচল মাত্র ৭১টি। বাকি ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে কিছু মেরামত করে সচল করার চেষ্টা চলছে। কিছু অকেজো হয়ে গেছে। ইঞ্জিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৫৩ সালে আসা ইঞ্জিন আছে তিনটি। যেগুলো ৭৩ বছরের পুরনো। ৬৫ বছরের পুরনো ইঞ্জিন আছে ৭টি, ৫৭ বছরের ৯টি, ৪৮ বছরের ১৫টি, ৪৫ বছরের ৮টি, ৩৮ বছরের ১৫টি, ৩১ বছরের ১৮টি ও ২৭-১৩ বছরের ৩৬টি। এ ছাড়া সর্বশেষ ২০২০ ও ২০২১ সালে আসা ২৯টি ইঞ্জিন রয়েছে। ট্রেন ট্র্যাকে যুক্ত হওয়ার পর ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। সে হিসাবে মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে প্রায় ১০৫টি ইঞ্জিনের।
এসব ইঞ্জিন দিয়ে ১৬৪টি ট্রেন পরিচালনা করে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। এর মধ্যে ৫৮টি আন্তঃনগর, ৬০টি মেইল, এক্সপ্রেস ও কমিউটার, ৩৮টি লোকাল ও ৮টি পণ্যবাহী ট্রেন।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, বেশি পুরনো ইঞ্জিনগুলোর যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না। ফলে মেরামত করলেও বিকল হয়ে যায়। এ ছাড়া ইঞ্জিন কম হওয়ায় এক গন্তব্য থেকে এসেই আরেক গন্তব্যে ছুটতে হয়। মাঝখানে ইঞ্জিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বিশ্রাম পাওয়া যায় না। যে কারণে পথে পথে বিকল হচ্ছে। ইঞ্জিনগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রয়েছে দক্ষ জনবলেরও অভাব।
















