একান্নবর্তী পরিবারের চিরাচরিত মেলবন্ধন ম্লান করে ছুটির দিনগুলোতে বিনোদন কেন্দ্রেই কেন ঝুঁকছে আধুনিক মানুষ!

ঈদে আত্মীয়ের দুয়ার ছেড়ে প্রকৃতির কোলে: আমরা কি তবে হারাচ্ছি একান্নবর্তী পরিবারের ঐতিহ্য?

27

বিশেষ প্রতিবেদনঃ বাঙালির চিরন্তন উৎসব মানেই ছিল নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা, ঈদের সকালে পাড়া-প্রতিবেশীর কোলাকুলি আর বিকেলে দল বেঁধে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে উৎসব উদযাপনের এই চেনা চিত্রে এসেছে এক বিশাল পরিবর্তন। সাম্প্রতিক সময়ে ঈদ উৎসবের দীর্ঘ ছুটিতে মানুষ এখন আর আত্মীয়-স্বজনের ঘরে না গিয়ে বেছে নিচ্ছেন সমুদ্র, পাহাড় কিংবা চা-বাগানের মতো দেশের বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণের প্রবণতা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর এক গভীর পরিবর্তন।

Advertisement

*​একান্নবর্তী পরিবারের ঐতিহ্য নষ্ট ও সামাজিক দূরত্বের বিস্তার*

​একটা সময় ছিল যখন যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারই ছিল বাঙালি সমাজের মূল ভিত্তি। ঈদে দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, ফুফু বা খালাতো ভাই-বোনদের এক ছাদের নিচে জড়ো হওয়া ছিল উৎসবের সবচেয়ে বড় আনন্দ। কিন্তু বর্তমানের শহুরে জীবনে সেই একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র বা একক পরিবারে রূপ নিয়েছে। বড় বড় দালানে আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা থাকলেও নানা কারণে ঘরগুলো অনেকটাই ফাঁকা।

​সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একক পরিবারের এই সংস্কৃতির কারণে নতুন প্রজন্মের কাছে এখন যৌথ পরিবারের আত্মীয়দের চেয়ে নিজের বাবা-মা ও ভাই-বোনদের নিয়ে কাটানো সময়টাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। ঈদে অন্য আত্মীয়দের বাসায় যাওয়ার চেয়ে তারা নিজেদের মতো করে কোয়ালিটি টাইম (মানসম্মত সময়) কাটাতে বেশি পছন্দ করছেন। আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করার যে চিরাচরিত সামাজিক দায়বদ্ধতা, তা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে এবং উৎসবের আনন্দ হয়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিক ও ব্যক্তি-কেন্দ্রিক।

*কিন্তু ​কেন এই পরিবর্তনের হাওয়া?*

বিনোদন কেন্দ্রের আকর্ষণের মূল কারণসমূহ:

​১. মানসিক ক্লান্তি ও ‘ডিজিটাল ডিটক্স’-এর খোঁজে
​আধুনিক ব্যস্ত জীবনে কর্মজীবী ও সাধারণ মানুষের একাংশ তীব্র মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যান। ঈদের ছুটিতে আত্মীয়দের বাসায় গিয়ে সামাজিক লৌকিকতা রক্ষা করার চেয়ে তারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে একটু জিরিয়ে নিতে চান। নাগরিক কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে সমুদ্রের গর্জন বা চা-বাগানের শান্ত পরিবেশ তাদের মানসিক ক্লান্তি দূর করতে টনিকের মতো কাজ করছে।

​২. উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী ভূমিকা – ​যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন মানুষের এই ঘরমুখো ভাব দূর করে বাইরে বের হতে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেছে। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি কক্সবাজার যাওয়ার দ্রুতগতির ট্রেন বা চার লেনের হাইওয়েগুলোর কারণে এখন যাতায়াত অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী। আগে যেখানে দূরপাল্লার যাতায়াত ছিল কষ্টের, এখন তা বিনোদনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

​৩. তরুণ প্রজন্মের ট্রেন্ড ও ভার্চুয়াল জীবন। ​ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের যুগে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ট্রাভেলিং বা ঘুরে বেড়ানো এখন একটা বড় ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’। ঈদের নতুন জামা পরে আত্মীয়ের ড্রয়িংরুমে বসে ছবি তোলার চেয়ে সমুদ্র সৈকতে সূর্যাস্তের ছবি বা চা-বাগানের সবুজ টিলার রিলস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার প্রবণতা অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে তাদের কাছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পর্যটন খাতের এই বিকাশ অর্থনৈতিকভাবে ইতিবাচক হলেও, এর ফলে আমাদের পারিবারিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে পড়ছে। উৎসবের মূল চেতনা যা ছিল পরোপকার, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং মিলেমিশে থাকা, তা এখন ক্রমশ রূপ নিচ্ছে নিজের আনন্দ ও ব্যক্তিগত বিনোদনে। তবে, এতোকিছুর মাঝেও সমাজের বিশাল একটি অংশ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে।আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকে এই চেষ্টা আমাদের স্বপ্ন দেখায় তাঁদেরই হাত ধরে হয়তো নতুন প্রজন্ম ফিরবে চিরচেনা একান্নবর্তী পরিবারের সেই ঐতিহ্য যদিও তা নতুন রূপ নিতে পারে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রা ও বিনোদনের ধরণ বদলানোটা স্বাভাবিক। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া নিশ্চয়ই ইতিবাচক, তবে তা যেন আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলোকে সুতো ছেঁড়া ঘুড়ির মতো বিচ্ছিন্ন করে না দেয়। ঈদ উৎসবের মূল সার্থকতা মিশে আছে সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্যে। তাই পর্যটনের আধুনিকতার পাশাপাশি একান্নবর্তী পরিবারের সেই চিরাচরিত সৌহার্দ্য ও লৌকিকতার ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখাই এখন সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

Advertisement