নতুন একটি স্মার্টফোন কেনার পরিকল্পনা ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুক্তাদীরুল ইসলাম আবিদের। কিন্তু শুধু ফোন কিনেই ফেরেননি তিনি। রেয়াজুদ্দিন বাজার ঘুরে একই দিনে কিনেছেন মোবাইলের প্রয়োজনীয় অ্যাকসেসরিজ, মেসের জন্য একটি ইলেকট্রিক কেটলি, রান্নাঘরের কিছু সামগ্রী, একটি টেবিল ল্যাম্প এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য আরও কয়েকটি পণ্য। তার ভাষায়, এক জায়গাতেই এত ধরনের পণ্য পাওয়া যায় যে আলাদা আলাদা মার্কেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
আবিদ বলেন, রেয়াজুদ্দিন বাজারে প্রায় সবকিছুই পাওয়া যায়। আমি এখানে এসে একটা মোবাইল কিনেছি। একই সঙ্গে মেসের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও নিয়েছি। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এখানে অনেক দোকান থাকায় দাম তুলনা করা যায়, দরদাম করা যায় এবং পণ্য হাতে নিয়ে দেখে-শুনে কেনা যায়। তাই প্রয়োজন হলেই আমি রেয়াজুদ্দিন বাজারে চলে আসি।
শুধু আবিদ নন, প্রতিদিন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো পাইকারি ও খুচরা ক্রেতা ভিড় করেন রেয়াজুদ্দিন বাজারে। অনেকেই ইলেকট্রনিক্স কিনতে এসে একই সঙ্গে ক্রোকারিজ, খেলনা, প্রসাধনী কিংবা গৃহস্থালি সামগ্রীও কিনে নিয়ে যান। পণ্যের বৈচিত্র্য, প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং সহজলভ্যতার কারণে বাজারটি ক্রেতাদের কাছে ‘ওয়ান-স্টপ হোলসেল মার্কেট’ হিসেবে পরিচিত।
এই চিত্রই বলে দেয়, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী রেয়াজুদ্দিন বাজার এখন শুধু একটি বাজার নয়, দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র। বিশেষ করে চীনের বিভিন্ন শহর থেকে আমদানি হওয়া বিপুল পরিমাণ পণ্যের কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে এটি এখন ‘চট্টগ্রামের গুয়াংজু বাজার’ নামে পরিচিত।
আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা ইকবাল বাহার চট্টগ্রামের রেয়াজুদ্দিন বাজারের পাইকারি ঘড়ির দোকান ‘ওয়াচ কিং’-এর নিয়মিত ক্রেতা। তিনি বলেন, আমি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের জন্য এখান থেকেই ঘড়ি কিনি। এখানে পছন্দমতো নানা ধরনের ঘড়ি পাওয়া যায়। কম দামের মধ্যে চীনা ঘড়িগুলোর ডিজাইনও বেশ আকর্ষণীয়। এক হাজার টাকার মধ্যেই ভালো মানের ঘড়ি কেনা সম্ভব। একই বাজেটে অনেক ব্র্যান্ডের দোকানে গেলে তুলনামূলক বেশি দাম দিতে হয়।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কৌশলগত অবস্থান এবং সমুদ্রবন্দরের সুবিধার কারণে রেয়াজুদ্দিন বাজারে চীনা পণ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য প্রসার ঘটছে। পণ্যের মান ও মূল্য সহজাত হওয়ায় চীনা পণ্যের প্রতি ক্রেতারা ঝুঁকছেন বেশি।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, চীনের গুয়াংজু, ইইউ এবং শেনজেনসহ বিভিন্ন উৎপাদনকেন্দ্র থেকে সরাসরি অথবা স্থানীয় আমদানিকারকদের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পণ্য প্রতিদিন এ বাজারে আসে। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে দশক দশক ধরে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেয়াজুদ্দিন বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য। এর মধ্যে রয়েছে মোবাইল ফোনের অ্যাকসেসরিজ, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, ব্লুটুথ স্পিকার, হেডফোন, স্মার্টওয়াচ, এলইডি লাইট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা পণ্য।
এ ছাড়া, গৃহস্থালি ও ক্রোকারিজ পণ্যেরও বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে এখানে। চায়না ক্রোকারিজ, ডিনার সেট, কাচ ও সিরামিক পণ্য, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, থার্মোস, ফ্লাস্ক এবং বিভিন্ন ধরনের স্টোরেজ সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
প্লাস্টিক ও গৃহসজ্জার সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পণ্য, খেলনা, কৃত্রিম ফুল, হোম ডেকোরেশন সামগ্রী এবং প্যাকেজিং উপকরণ। একই সঙ্গে পোশাক ও ফ্যাশন খাতে রেডিমেড গার্মেন্টস, জ্যাকেট, টি-শার্ট, ব্যাগ, লাগেজ, প্রসাধনী, বিউটি প্রোডাক্ট, ফ্যাশন জুয়েলারি ও ঘড়ির বড় বাজারও গড়ে উঠেছে।
শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতের জন্যও রেয়াজুদ্দিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন ধরনের হার্ডওয়্যার পণ্য, ছোট যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ, প্যাকেজিং উপকরণ এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত নানা সরঞ্জাম পাওয়া যায়।
এ ছাড়া, ঈদ, দুর্গাপূজা ও অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে মৌসুমি সাজসজ্জার পণ্য, উপহারসামগ্রী, শিশুদের খেলনা, স্টেশনারি এবং স্বল্পমূল্যের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের বড় সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত বাজারটি।
রেয়াজুদ্দিন বাজার বণিক সমিতির তথ্যমতে, বাজার এলাকায় ১১০টির বেশি মার্কেট ও বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে। এসব মার্কেটে প্রায় ১৫ হাজার দোকান পরিচালিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার এবং কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় আট হাজার।
যদিও সরকারি কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই, তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, স্বাভাবিক সময়ে রেয়াজুদ্দিন বাজারে প্রতিদিন কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয়। সে হিসাবে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। ঈদ ও অন্যান্য উৎসবের মৌসুমে এই লেনদেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
কাপড়, ইলেকট্রনিক্স, প্রসাধনী, আমদানি করা পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং বিশেষ করে চীনা পণ্যের বৃহৎ পাইকারি কেন্দ্র হিসেবে রেয়াজুদ্দিন বাজারকে অনেকেই চট্টগ্রামের পাইকারি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বলে অভিহিত করেন। এখান থেকে চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত পণ্য সরবরাহ করা হয়।
ব্যবসায়ীদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা এবং চীনের উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে রেয়াজুদ্দিন বাজারে চীনা পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদা উভয়ই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার হিসেবে এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তামাকুন্ডি লাইন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন, রেয়াজুদ্দিন বাজার এখন শুধু চট্টগ্রামের নয়, সারা দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র। বিশেষ করে চীনা পণ্যের ক্ষেত্রে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অসংখ্য ব্যবসায়ী এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল। চীনের বিভিন্ন শহর থেকে সরাসরি এবং আমদানিকারকদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পণ্য আসছে। এখান থেকে চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও পার্বত্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নিয়মিত পণ্য সংগ্রহ করেন।
তিনি বলেন, ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল অ্যাকসেসরিজ, ক্রোকারিজ, গৃহস্থালি সামগ্রী, খেলনা, প্রসাধনী থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় নানা ধরনের পণ্য এক জায়গায় পাওয়া যায় বলেই রেয়াজুদ্দিন বাজারকে অনেকেই ‘চট্টগ্রামের গুয়াংজু বাজার’ বলে থাকেন। চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় আমদানি করা পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছে যায়, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সুবিধা।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাজারে ১১০টির বেশি মার্কেট ও বাণিজ্যিক ভবনে প্রায় ১৫ হাজার দোকান রয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্যের লেনদেন হয় এবং উৎসব মৌসুমে এই বাণিজ্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পণ্যের বৈচিত্র্য ও ব্যবসার পরিধির কারণে রেয়াজুদ্দিন বাজার দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।

















