লোক-ঐতিহ্যর সুরে,রবীন্দ্র চেতনার আলোয়, “একতারা ও রবীন্দ্র বীনা”

1

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণ দিবস বাইশে শ্রাবন স্মরণে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের আয়োজনে “একতারা ও রবীন্দ্র বীনা” শীর্ষক সাংস্কৃতিক নিবেদন আজ ২০ আগস্ট, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬ টায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়।

Advertisement

শরতের স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় বাংলার লোকজ বাউল সুর ও ভাবধারায় অনুপ্রাণিত রবীন্দ্র সংগীত ও বাউল গানের এক অনন্য মেলবন্ধনে মুখরিত হয়ে উঠেছে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ। আবহমান বাংলার চিরন্তন সৌন্দর্য, লোক ঐতিহ্য ও রবীন্দ্র চেতনার এই সুর সম্মিলনে মাটির সুর ও মননের আলোয়, মানবতার চেতনায় স্মরণ করা হয় কবিগুরুকে।

অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি এবং চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সভাপতি বিশিষ্ট সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক জসীম চৌধুরী সবুজ।

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সাধারন সম্পাদক এডভোকেট অসীম বিকাশ দাশের সঞ্চালনায় সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম  কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক সুধীর বিকাশ দেব,কবি, নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অভীক ওসমান,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ শেখ সাদী প্রমুখ।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক সুধীর বিকাশ দেব বলেন, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে উদীচীর আজকের এই আয়োজন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাউল দর্শনের মূল ভিত্তি হলো মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে অন্তরের ‘মনের মানুষ’  খুঁজে পাওয়ার আকুলতা। এই মরমী লোকদর্শন কবিকে প্রথাগত ও সংকীর্ণ সামাজিক সংস্কারের বিরুদ্ধে এক গভীর প্রগতিশীল অবস্থানে উন্নীত করেছিল। বাউলদের মতো রবীন্দ্রনাথও বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর কোনো দূরের মন্দিরে বা মসজিদে বন্দি নন, তিনি মানুষের অন্তরে ‘মনের মানুষ’ হিসেবে বাস করেন।
‎বাউলদের সহজিয়া সাধনা কবিকে মাটি, প্রকৃতি এবং মানবদেহের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক অনুধাবনে সাহায্য করেছিল।লালন শাহ ও গগন হরকরার মতো গ্রামীণ বাউল সাধকদের সান্নিধ্য পেয়ে তিনি নিজেকে একজন ‘রবীন্দ্র-বাউল’ বলে পরিচয় দিতে ভালোবেসেছিলেন। বাউল দর্শনের প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ জাতিভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক উগ্রতার তীব্র সমালোচনা করেন। বাউলদের মতো তিনিও সব মানুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করতেন।অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি: হিন্দু, মুসলমান ও সুফি ধারার মিলনে তৈরি বাউল সংস্কৃতির উদারতা রবীন্দ্রনাথের মননে সর্বধর্ম সমন্বয় ও বিশ্বমানবতার প্রগতিশীল চেতনা গড়ে তোলে। তাঁর গানে ও নাটকে বাউলের সুর ও একতারার আকুতি কেবল আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং মানুষের মুক্তি ও আত্মিক স্বাধীনতার জয়গান গেয়েছে।বাউল দর্শন রবীন্দ্রনাথের চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি বাউল ফকিরদের গান শুনে আপ্লুত হতেন — বাউলের সহজিয়া সাধনা,অন্তরের মানুষকে উন্মোচিত করা,বাহ্যিক বিভাজনের উর্ধ্বে মানুষের সত্যকে আবিস্কারের আকাঙ্ক্ষা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল চেতনার সাাথে তৈরী করেছিল এক গভীর আত্মীয়তা। তিনি বিশ্বাস করতেন,মানব মুক্তি,আত্মমর্যাদা, স্বাধীন চেতনা ও বিশ্বমানবতা হল বাউল চেতনার অন্যতম দৃষ্ঠিভঙ্গী।

‎নাট্যকার অভীক ওসমান বলেন,আজকের বিভাজিত সময়ে বাউল এবং রবীন্দ্রনাথের মানবিক দর্শন এবং মূল্যবোধ অতীব প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তরে ও সৃষ্টিতে বাউল দর্শন ছিল এক গভীর জীবনবোধ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে চেনা এবং প্রকৃতির মাঝে পরমাত্মাকে উপলব্ধি করার সরলতা প্রকাশ পায়। তিনি নিজেকে ভালোবেসে “রবীন্দ্র-বাউল” বলেও পরিচয় দিতেন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ সাদী বলেন,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক প্রগতিশীল মানবতাবাদী ও সংস্কারক। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক অর্থে কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রগতিশীল বা বামপন্থী আন্দোলনে যুক্ত না থাকলেও, তাঁর চিন্তা, সাহিত্য ও কর্মে সাম্যবাদ, মানবমুক্তি, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সমাজ সংস্কারের গভীর প্রগতিশীল ধারা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।সমাজ সংস্কার ও মানবতাবাদ অস্পৃশ্যতা ও জাতিভেদ বিরোধিতা,এবং  সমাজের নিচুতলার মানুষের প্রতি তাঁর ছিল গভীর দরদ। তিনি জাতপ্রথা ও অস্পৃশ্যতার তীব্র সমালোচনা করেন।নারীর অধিকার বিষয়ে  তাঁর বহু সাহিত্য ও প্রবন্ধে নারী স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন।শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যার বদলে প্রকৃতিবাদী ও সর্বজনীন প্রগতিশীল শিক্ষাব্যवস্থা চালু করেন।সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং অন্ধ বা উগ্র জাতীয়তাবাদের বদলে তিনি সবসময় বিশ্বমানবতার জয়গান গেয়েছেন।সাম্রাজ্যবাদ ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বহু নীতির প্রকাশ্য সমালোচনা করেন তিনি। জীবনের শেষভাগে হিটলার ও ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছিলেন। সাহিত্য ও শিল্পে আধুনিকতা ভাষার সংস্কারে সাধু ভাষার কৃত্রিম কাঠিিন্য ভেঙে প্রমিত ও চলিত ভাষাকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শেষপর্যায়ের নাটক ও কবিতায় যন্ত্রসভ্যতার নির্মম গ্রাস থেকে মানুষকে বাঁচানোর এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পক্ষে প্রগতিশীল রূপক ও বার্তা ফুটে উঠেছে তাঁর বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীল সব কর্মে।

জসীম চৌধুরী সবুজ বলেন,সংস্কৃতি কেবল অতীতকে স্মরণ করার বিষয় নয় বরং সংস্কৃতি মানুষের মনে চেতনা জাগ্রত করে,বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি যোগায় এবং মানুষকে মানুষের নৈকট্য নিয়ে আসে।তিনি আরও বলেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় শোষণ, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ,বৈষম্য ও মানুষের উপর মানুষের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সংগ্রামে অবিচল থেকে মানব মুক্তির জয়গান গেয়ে ইতিহাস অর্পিত দায়িত্ব পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।

‎আলোচনা সভা শেষে সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বোয়ালখালী থানা সংসদ,নৃত্য পরিবেশন করেন মাধবী নৃত্যকলা একাডেমী এবং এর পরেই   অপর্না চৌধুরীর সংগীত পরিচালনায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের শিল্পীকর্মীদের  “একতারা ও রবীন্দ্র বীণা” সুর আলেখ্য  পরিবেশন করা হয়,উপস্থিত দর্শক স্রোতা এই আয়োজন উপভোগ করে বিমোহিত হয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করেন।সর্বশেষ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সংগটন সংগীতের মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্য এই আয়োজনের পরিসমাপ্তি হয়।

Advertisement