চট্টগ্রামে দ্রুত গতিতে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ

147

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলছে। প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন গড়ে ২৫ জন। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৭শ’ ছুঁইছুঁই, মৃত্যু হয়েছে ১২ জনের। ঈদের পর থেকে সরকারি বেসরকারি সব হাসপাতালে বেড়েছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু।

Advertisement

চিকিৎসকরা বলছেন— এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা অন্য সব বছরকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে বাড়তে পারে মৃত্যুর সংখ্যাও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখন থেকে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে সংক্রমণের মাত্রা মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।

যদিও ডেঙ্গুর এমন পরিস্থিতিতে ১০০ দিনের ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরুর মধ্য দিয়ে ‘ঘুম’ ভেঙেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। গেল ২২ জুন ঢাকডোল পিটিয়ে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করে সংস্থাটি। এমনকি ড্রোন কিনে ছাদ পর্যবেক্ষণ করে জরিমানাসহ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন খোদ চসিক মেয়র। যদিও তার ছিটেফোঁটাও চোখে পড়েনি নগরবাসীর। কিন্তু এরমধ্যেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে শনাক্তের হার।

বন্দরনগরীর ফিরোজ শাহ কলোনির ব্যাংক কর্মকর্তা ডেঙ্গু আক্রান্ত ইকবাল হোসেন বলেন, আমার ছেলের ডেঙ্গুর টেস্ট করানো হয়। তখন ওর পজেটিভ আসে। তখন আমাদের সন্দেহ হলে আমরাও টেস্ট করায়। তখন আমার মেয়ের ও আমার পজেটিভ আসে।

চট্টগ্রাম মেডিকেলসহ অন্যান্য হাসপাতালের চিত্রও একই। আক্রান্তদের ৬০ ভাগই শিশু। ঈদের পর থেকে রোগী বাড়ছে বলে জানান চিকিৎসকরা।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. ফারহানা আক্রার বলেন, রোগীদের ফ্লুয়িড লিকেজ হয়, প্লাজমা লিকেজ হয়, যার কারণে তাদের প্রেশার ফল করে। তাদের বিপিটা মেনটেইন করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়। রক্তে তাদের প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যাওয়ার কারণে রেগুলার তাদের ব্লাড মনিটরিং করতে হয়।

চলতি জুলাই মাসের প্রথম ৫ দিনেই চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৯৭ জন। জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসা বেশিরভাগেরই ধরা পড়ছে ডেঙ্গু।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৬৬১ জনের, আর মারা গেছেন ১২ জন।তারমধ্যে চট্টগ্রাম নগরের ৪৬১ জন এবং বিভিন্ন উপজেলায় ২০০ জন। এরমধ্যে জানুয়ারিতে শনাক্ত হয় ৭৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন, মার্চে ১২ জন, এপ্রিলে ১৮ জন, মে মাসে ৫৩ জন, জুনে ২৮২ জন। তবে মারা যাওয়া ১১ জনের মধ্যে ৩ জন জানুয়ারি মাসে এবং জুনে ৬ জন এবং জুলাইয়ে (৫ তারিখ পর্যন্ত) ৩ জন মারা গেছেন। এছাড়াও আক্রান্ত হওয়াদের মধ্যে পুরুষ ৩৩৮ জন, নারী ১৬৯ জন এবং শিশু ১৫৪ জন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ডেঙ্গুবিষয়ক সর্বশেষ দৈনিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৮ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১ জনের। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১২৬ জন। চট্টগ্রামে ডেঙ্গু শনাক্ত ঊর্ধ্বমুখী বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন— এ বছর আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগীদের বৈশিষ্ট্য অন্যবছরের তুলনায় কিছুটা আলাদা। আক্রান্ত রোগীর অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি বেশির ভাগের রক্তচাপ কম পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি রক্তের অণুচক্রিকাও (প্লাটিলেট) কম পাওয়া যাচ্ছে।

এ বিষয়ে বিআইটিআইডি হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশিদ  বলেন, গত মাস থেকেই রোগী বেড়ে গেছে। হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নাই। তবে এখনো পর্যন্ত যতজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তাদের কারও অবস্থা সংকটাপন্ন হয়নি। আরেকটা বিষয়, এবারে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের রক্তে প্লাটিলেট কম পাওয়া যাচ্ছে। সেইসাথে তাদের বেশিরভাগের রক্তচাপও কম।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রভাবে এ রকমটা হচ্ছে তা নিশ্চিত হতে আমরা নমুনা সংগ্রহ করছি। সেই নমুনা ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানো হবে। উনারা পরীক্ষা করতে দেশের বাইরে পাঠাবেন। এরপরই ডেঙ্গুর ধরন নিশ্চিত হওয়া যাবে। তাছাড়া ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। সেইসাথে এটি প্রতিরোধ করতে হলে ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

একই বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামে ডেঙ্গু শনাক্ত ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এ মাসের শুরু থেকেই শনাক্তের হার বাড়ছে। বছরের শুরুর দিকের চেয়েও এখন রোগী শনাক্ত হচ্ছে বেশি। তবে যেসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন, তাঁদের মধ্যে কারও অবস্থা গুরুতর নয়। এই সময়টাতে এমনিতেই ডেঙ্গু সংক্রমণ বেড়ে যায়। তাই যেসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে, সেই সব এলাকায় অবশ্যই মশক নিধন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে।’

Advertisement