চট্টগ্রাম নগরের উত্তর কাট্টলির বাসিন্দা আকলিমা বেগম একরাতে দেখলেন, তাঁর দেড় মাসের শিশু রুবাইয়া জান্নাতের তীব্র জ্বর ও শ্বাসকষ্ট। বুকের দুধ মুখে তুলছে না। ঘাবড়ে গিয়ে মেয়েকে নিয়ে ছুটলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। ভর্তি নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক জানান– রুবাইয়া নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। চিকিৎসা শুরু হলেও তিন দিনের মাথায় তার মৃত্যু হয়।
তীব্র শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় এখন চট্টগ্রামে রুবাইয়ার মতো অনেক শিশুই আক্রান্ত হচ্ছে, যাদের অনেকেই মারা যাচ্ছে। চিকিৎসকদের তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামে ৩৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যাদের ২১ জনই (৬০ শতাংশ) ছিল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত এবং বেশির ভাগের বয়স এক থেকে ছয় মাস।
চমেক হাসপাতালের তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে ১ হাজার ৪৭৪ শিশু ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় মারা গেছে ২৩ শিশু। একই সময়ে চট্টগ্রামের বিশেষায়িত মা ও শিশু হাসপাতালে ৫ এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ৭ শিশু
নিউমোনিয়ায় মারা গেছে। বর্তমানে হাসপাতালের শিশু বিভাগে প্রতিদিন ৪৫ থেকে ৬০ শিশু ভর্তি হচ্ছে। হঠাৎ নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগী বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেন সেবা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেছেন, নিউমোনিয়া ফুসফুসের প্রদাহজনিত রোগ। শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। প্রাথমিকভাবে অভিভাবকরা ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খাওয়াচ্ছেন, দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসায় রোগ জটিল আকার নিচ্ছে এবং বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। রোগটি থেকে সুরক্ষায় শিশুকে জন্মের পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। কারণ বুকের দুধে নিউমোনিয়া প্রতিরোধক ভিটামিন ‘এ’ থাকে। যেসব শিশুর ঘন ঘন সর্দি-কাশি হয়, তাদের ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেবিন চৌধুরী বলেছেন, শিশু বিভাগে সম্প্রতি শয্যার কয়েক গুণ রোগী ভর্তি থাকছে। অসুস্থদের বড় অংশ শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। ছয় মাসের কম বয়সীদের মৃত্যু হচ্ছে বেশি।
চট্টগ্রামে গত কয়েক দিন ধরে জেঁকে বসেছে শীত। তাপমাত্রা থাকছে ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি। দুপুরের পর থেকে বইছে হিমেল হাওয়া, যা সন্ধ্যার পর তীব্র হচ্ছে। এরই প্রভাবে জ্বর, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় কাবু হচ্ছে শিশুরা।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান বলেছেন, হাসপাতালে এক সপ্তাহে ২৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন রেকর্ডসংখ্যক নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শীত কমে না আসা পর্যন্ত রোগীর এ চাপ থাকবে।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস নিলে কিংবা শ্বাস নিতে অস্বস্তি অনুভব করলে চিকিৎসক দেখাতে হবে। শীতের সময়ে ছয় মাসের কম বয়সীদের ঘন ঘন স্তন্যপান করাতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে শিশু টেনে দুধ পান করতে পারছে কিনা। শ্বাস নেওয়ার সময় শব্দ, বুকের পাঁজরের নিচের অংশ দেবে যাচ্ছে কিনা, জ্বর, বমির মতো শিশুর নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলোর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।
















