২৭০ কোটি টাকা ব্যায়ে ১ কিলোমিটার!

201

ধারনা করা হচ্ছে এ উপমহাদেশের অন্যতম ব্যয়বহুল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নাম ‘লালখান বাজার-বিমানবন্দর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রায় ১৬ কিলোমিটার (১৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার) দৈর্ঘ বিশিষ্ট এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩’শ কোটি টাকা! প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে প্রায় ২৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক কিলোমিাটর ফ্লাইওভার নির্মানের জন্য ব্যয় ২৭০ কোটি টাকা। এ খরচের মধ্যে হওয়ার কথা ছিল আরও ৫টি র‌্যাম্প। সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাদ দেয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করেও এটির মধ্যে রয়েছে জোড়াতালি, পিলারে দেখা দিয়েছে ফাটল। হয়েছে তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রধান সাবেক এমপি এম এ লতিফ এখন কারাগারে। ফলে তদন্ত রিপোর্টও আলোর মুখ দেখেনি।

Advertisement

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাহাড়, নদীসহ বিভিন্ন বিপদসঙ্কুল ও দূর্গম এলাকার উপর দিয়ে এ ধরনের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়। খরচ বেশি পড়ে নানা কারণে। কিন্ত কিছুটা আকাবাকা হলেও এ রকম সোজা রাস্তায় প্রতি কিলোমিটার নির্মানে ২৭০ কোটি টাকা খরচকে অনেকে লুটপাটের মহা-উৎসব বলে মনে করছেন।

বিষয়টি নিয়ে সিডিএ এর নবনিযুক্ত বোর্ড সদস্য জাহিদুল করিম কচি বলেন, সিডিএ’তে আগাগোড়ায় দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট সক্রিয়। এ সিন্ডিকেটের সাথে বেশ কিছু প্রকৌশলীও যুক্ত রয়েছেন। লালখান বাজার হতে বিমান বন্দর পর্যন্ত (তাও বিমান বন্দর পর্যন্ত যায়নি) ১৬ কিলোমিটারের এই এক্সপ্রেসওয়ে কি সোনা দিয়ে মোড়ানো যে, এত ব্যয় হবে? সব তো লুটপাট হয়েছে। আমরা কি বুঝি না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে যে পরিমান দুর্নীতি হয়েছে তা বলাবাহুল্য। পৃথিবীর কোন দেশে এক কিলোমিটার ফ্লাইওভার তৈরিতে ২৭০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে আমার জানা নেই। চেষ্টা করছি দুর্নীতির হদিস বের করতে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেকটা একই সময়ে ভারতের তামিলনাড়ুতে কৈয়ামবেদু ফ্লাইওভার নির্মানে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়েছে ভারতীয় মুদ্রায় ৯৫ কোটি রুপি। এটি ৪ লেন বিশিষ্ট ফ্লাইওভার। তামিলনাড়ুর রিটটেরি, পালাভারাম এবং মেধাবাকাম তিন লেনের ফ্লাই ওভারে ব্যয় হয়েছে প্রতি কিলোমিটার ৪৮ কোটি রুপি। এ উপমহাদেশে বর্তমান সময়ে ৪ লেনের ফ্লাইওভার নির্মানে স্বীকৃত ব্যয় হিসেবে বাংলাদেশেই ব্যয় বেশি ধরা হয়। যার খরচ দেখানো হয় গড়ে ১২৩ কোটি টাকা। যা ভারতে ১০০ কোটি এবং পাকিস্তানে ৭০ কোটি টাকা।

অনুসন্ধান মতে, নগরের লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যৌথভাবে কাজ করছে বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও চীনের র‌্যাঙ্কিন। ২০১৭ সালে একনেকে অনুমোদন হওয়ার সময় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। প্রকল্পটি তিন বছরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্ত ২০২২ সালে নকশা ‘সংশোধন’ করে একলাফে আরও এক হাজার ৪৮ কোটি টাকা (আগের ব্যয়ের চেয়ে ৩২ শতাংশ) ব্যয় বাড়িয়ে মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ উড়াল সড়ক নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা।

চট্টগ্রামের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে প্রস্তাাবিত ১৪টি র‌্যাম্প করার কথা ছিল। এ র‌্যাম্পের ব্যয়ও মূল বরাদ্দে ছিল। কিন্ত টাইগারপাসসহ ৫টি র‍্যাম্পেের কাজ আপাতত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিডিএ। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাটির নবগঠিত বোর্ডের প্রথম সভায় বেশিরভাগ সদস্য যানজট সৃষ্টি হবে এমন র‌্যাম্প নির্মাণ না করার পক্ষে মত দেন। যেগুলোর কাজ আপাতত হবে না সেগুলো হচ্ছে- টাইগারপাস অংশে পলোগ্রাউন্ডের দিক থেকে ওঠার র‌্যাম্প, আগ্রাবাদের জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের সামনে নামার র‌্যাম্প, কেইপিজেডে নামার একটি র‌্যাম্প এবং আগ্রাবাদের এক্সেস রোডের ওঠা–নামার দুটি র‌্যাম্প। এসব র‌্যাম্প করা হলে ব্যয় আরও বাড়তো।

প্রকল্পের কাজ শেষ হতে না হতেই গত বছরের ২৮ অক্টোবর এটির উদ্বোধন করা হয়। শেষপর্যন্ত দেখা যায় বিপুল ব্যয়ের এ প্রকল্পটি অনেকটা জোড়াতালির মতো হয়ে গেছে। উড়াল সড়কটির বিভিন্ন পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে হৈচৈ হলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বন্দর আসনের সংসদ সদস্য এম এ লতি কে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। যদিও কমিটির প্রধান এম এ লতিফ এখন কারাগারে। তদন্ত রিপোর্টও আর আলোর মুখ দেখেনি। অবশ্য এম এ লতিফ গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করে গেছেন যে, এক্সপ্রেসওয়ের উপরে দুপাশের সীমানা দেয়ালে যে ক্লাম লাগানো হয়েছে- সেগুলো মানসম্মত নয়। ফিনিশিংয়ে কিছু সমস্যা আছে। দুয়েক জায়গায় রডও বেরিয়ে আছে। এসব অসঙ্গতি প্রকল্প পরিচালক ও কনসালটেন্টকে দেখিয়েছি।”ফাটলের বিষয়ে এম এ লতিফ বলেছিলেন, “কিছু ফাটল এখানে (লালখান বাজার অংশের পিলারে) দেখেছি। ছবি তুলে নিয়েছি। আমরা বিশেষজ্ঞ নই। বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করব। আমাদের তিন মাস সময় আছে। নির্মাণ কাজে কোথাও কোন অনিয়ম হয়েছে কি না তা সব দেখে প্রতিবেদন দেব। এটা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া চার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এতে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। অনিয়ম হলে জেল জরিমানাসহ সব শাস্তি হবে, সরকার কাউকে ছাড় দেবে না।”

বিগত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অনেক কিছুই ওলট পালট হয়ে যায়। এ প্রকল্পের পেছনে যে ব্যয় হয়েছে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ৩৯০টি পিলার ও ৪০০টি গার্ডারের ওপর দাড়িয়ে আছে এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ ধরনের প্রকল্পে এত বিপুল পরিমাণ ব্যয় এ উপমহাদেশের কোন দেশের প্রকল্পে হয়েছে কিনা সংশয় রয়েছে। সাধারণত একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মান করতে গেলে ঐ এক্সপ্রেসওয়ের নিচে পাহাড়, নদীসহ বিভিন্ন অবকাঠামো থাকলে ব্যয় বাড়ে। কিন্ত সমান্তরাল পথের উপর এ ধরনের প্রকল্পে এত ব্যয় কিভাবে হলো তা নিয়ে তদন্ত করার প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। বিশেষ করে উড়াল সড়কটির জন্য ভূমি বরাদ্দে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

Advertisement