অকার্যকর কমিটি থেমে নেই টাকা উত্তোলন

রেলওয়ে সমবায়ে চরম বিতর্কে সচিব সাখাওয়াত

963

বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতি (সীমিত) চট্টগ্রামে এক মাস সতেরো দিনের বেশি সময় ধরে সমিতির ব্যাংক হিসাব থেকে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূতভাবে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে সমিতির সচিব সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে।

Advertisement

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচিত পরিচালকমণ্ডলী আইন অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় বর্তমান কমিটি কার্যকর নয়। অথচ এই অকার্যকর কমিটির কয়েকজনের যোগসাজশে সচিব যৌথ স্বাক্ষরের নামে নিয়ম ভেঙে নিয়মিতভাবে টাকা উঠিয়ে নিচ্ছেন। এ ঘটনায় রেলওয়ের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

বিধিঅনুযায়ী কমিটি নেই, তবু চলছে অর্থ উত্তোলন

রেলওয়ে সমবায় সমিতি সমবায় আইন–২০০১, সংশোধিত ২০১৩, সমবায় বিধিমালা–২০০৪ ও নিজস্ব উপবিধি অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালনা কমিটি ১২ সদস্যের ৮ জন নির্বাচিত এবং রেলওয়ে মহাপরিচালকের মনোনীত ৪ কর্মকর্তা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে চতুর্থ গ্রেডের একজন সরকারী কর্মকর্তাকে সভাপতি, পঞ্চম গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে সহ-সভাপতি ও নবম গ্রেডের দুইজন সরকারী কর্মকর্তাকে পরিচালক পদে মনোনীত করে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। এবং ব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ সমবায় আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ৩ বছর।

বিগত কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৫ এর ১৯ অক্টোবর। এর আগে ২৭ আগস্ট জেলা সমবায় অফিসারের কাছে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনের আবেদন করা হয়। পরবর্তীতে জেলা সমবায় কার্যালয় তিন সদস্যের নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠনও করে। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমানকে। সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় পাহাড়তলীর বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (কারখানা) মো. মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া এবং রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) মো. আরিফুজ্জামানকে।

কিন্তু ৭ অক্টোবর তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় সেই কমিটি কার্যক্ষমতা হারায়। এরপর নির্বাচন পরিচালনা কমিটি জেলা সমবায় অফিসারের অনুমোদন ছাড়াই ১৫ অক্টোবর নতুন তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন আয়োজন করে। যেটি এখতিয়ারবহির্ভূত বলে অভিযোগ।

বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত ৮ পরিচালক এবং রেলওয়ে প্রশাসনের মনোনীত সভাপতি–সহসভাপতি পরিচালক নির্বাচনের ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রথম বৈঠক করতে বাধ্য। কিন্তু নির্বাচিত কেউই দায়িত্ব না নেওয়ায় বিধিমালার ২৬(২) ও ২২(৩) অনুসারে কমিটি কার্যকারিতা হারায়। এ অবস্থায় কোনো পরিচালক বৈধ নন। তবু তাঁদের স্বাক্ষরে চেক ইস্যু ও নগদায়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে সভাপতি, সহ-সভাপতি এবং দুইজন পরিচালক এখনও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সমিতির বিদ্যমান উপ-বিধি, সমবায় আইন ও সমবায় বিধিমালা অনুযায়ী নির্বাচিত পরিচালক ও মহাপরিচালকের মনোনীত সভাপতি, সহ-সভাপতি ও দুইজন পরিচালক নির্বাচনের ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে কার্যভার গ্রহন করতে হবে।

যৌথ হিসাব থেকে ‘অবৈধ উত্তোলন’

সমিতির ব্যাংক হিসাব পরিচালনার নিয়ম হলো, সচিব এবং একজন পরিচালক যৌথ স্বাক্ষরে লেনদেন। কিন্তু কার্যকর পরিচালনা কমিটি না থাকায় এসব স্বাক্ষর আইনগতভাবে বৈধ নয়। তবু গত এক মাসের বেশি সময় ধরে সচিব সাখাওয়াত হোসেন লক্ষ লক্ষ টাকার চেক ইস্যু করে নগদায়ন করছেন। ডেসপাস শাখার ইস্যুকৃত চেক রেজিস্টারেও যার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

নথি অনুযায়ী ২৪ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১০০টি লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রত্যেকটি লেনদেনের টাকার অংক এবং হিসাব নম্বর প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত আছে।

রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতির ১২ জন সদস্য দায়িত্বভার গ্রহন সম্পন্ন হয়নি অথচ সচিব সাখাওয়াত হোসেন অকার্যকর কমিটির পরিচালকদের সাথে যোগসাজসে সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে প্রতারনার আশ্রয় নিয়ে বিধি বর্হিভূতভাবে সমিতির সোনালী ব্যাংক সিআরবি শাখা থেকে অর্থ উত্তোলন করে যাচ্ছেন।

একজন সদস্য অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতির সকল হিসাব পরিচালিত হয় যৌথ স্বাক্ষরে। সমিতির সচিব এবং একজন পরিচালকের স্বাক্ষরে। যেহেতু নিয়মিত কমিটি সমবায় আইন, বিধিমালা ও উপ-বিধি অনুযায়ী দায়িত্বভার গ্রহনে ব্যর্থ হয়েছেন, অকার্যকর কমিটির পরিচালকদের সাথে যোগসাজসে সমিতির ব্যাংক হিসাব হতে সমিতির সচিব অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি সম্পূর্ন ফৌজদারী অপরাধ।

সমবায় অধিদপ্তর ও জেলা সমবায় কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েও মিলছেনা প্রতিকার

ইতিমধ্যে সমিতির একজন সদস্য নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ঘোষিত তফসীল ও নির্বাচন অবৈধ বলে জেলা সমবায় অফিসারের কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার প্রেক্ষিতে জেলা সমবায় কার্যালয়ে আরবিট্রেশন চলমান। অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেয়ায় সমবায় কর্মকর্তার দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সমিতির একজন সদস্য প্রশ্ন তুলেছেন, জেলা সমবায় কার্যালয় কেন নীরব? রেলওয়ে প্রশাসনও বিষয়টি উপেক্ষা করছে বলে কর্মচারীদের অভিযোগ উঠেছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জেলা পর্যায়ের সকল সমিতি দেখভালের দায়িত্ব জেলা সমবায় অফিসারের। জেলা সমবায় কার্যালয়ও এর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

সচিব সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে আগেও দুর্নীতির অভিযোগ দুদকে দেওয়া হয়েছিল তবে কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। রেলওয়ে কর্মচারীদের অভিযোগ, সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে পুরনো সব অভিযোগ চাপা পড়ে গেছে রেলওয়ের কিছু প্রভাবশালী মহলের সহায়তায়।

শুধু তাই নয়, চট্টগ্রামে আলোচিত সিআরবি ডাবল মার্ডার মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মচারী মনিরুজ্জামান দিনার। তিনি দীর্ঘ ১ বছর ৮ মাস বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তবুও সচিব সাখাওয়াত তাকে পুনরায় কাজে ফিরিয়ে আনতে চাপ প্রয়োগ ও নথি প্রসেস করছেন এমন অভিযোগ রয়েছে রেলওয়ের ভেতর থেকেই।

অভিযোগে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য, সাখাওয়াত হোসেন জাল অভিজ্ঞতা সনদ দিয়ে সচিব পদে চাকরি পেয়েছেন। অভিযোগ সূত্র বলছে, ১৫ লাখ টাকার লেনদেনের মাধ্যমে তার নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়। এ ছাড়া সমিতির নামে কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে একটি বেনামি ও মালিকানাবিহীন জমি কেনার অভিযোগও উঠেছে, যার প্রকৃত মালিকানা আজ পর্যন্ত সমিতি শনাক্ত করতে পারেনি। অভিযোগকারীদের দাবি, এটি ছিলো টাকা লোপাটের একটি কৌশল।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সচিব সাখাওয়াত হোসেনের পিতা রেলওয়ের সাবেক পে-সহকারী মো. আব্দুস ছাত্তার। তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সিরাজের ঘনিষ্ট সহযোগী হওয়ায় ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে অভিজ্ঞতা সনদ জাল করে বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতির সচিব পদে নিয়োগ দেন তার ছেলে সাখাওয়াত হোসেনকে। সচিব পদে সাখাওয়াত নিয়োগ পাওয়ার পর সমিতির নামে সিরাজ সিন্ডিকেটের সাথে যোগসাজসে কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে বেনামি ও ভূয়া মালিকানা দেখিয়ে একটি জমি কিনেন। দীর্ঘ একযুগেরও বেশি সময়ে সমিতির নামে কেনা জমি চিহ্নিত করতে পারেননি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে জমির মালিক ভূয়া এবং তার কোনো ঠিকানা নেই। জমি ক্রয়ের নামে যোগসাজসে অর্থ লোপাট করছে সচিব সাখাওয়াত ও শ্রমিকলীগ নেতা সিরাজ গং।

এদিকে রেলওয়ে শ্রমিক–কর্মচারীদের দাবি, অবৈধ অর্থ উত্তোলন বন্ধ না করলে, ও সচিব সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে উঠবে। তাঁরা সমবায় আইন অনুযায়ী সচিবের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে সমবায় মন্ত্রণালয়, জেলা সমবায় দপ্তর এবং রেলওয়ে প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ে সমবায় সমিতির সচিব সাখাওয়াত হোসাইনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, রেলওয়ে মহাপরিচালক কর্তৃক চারজনের নিয়োগের অর্ডার হয়েছে খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হবে তবে এর আগেও আমরা চাইলে চেকের মাধ্যমে বিল উত্তোলন করতে পারি।

বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধক চট্টগ্রাম দুলাল মিয়ার কাছে জানতে চাইলে, তিনি চট্টগ্রাম জেলা নিবন্ধকের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।

জেলা নিবন্ধন চট্টগ্রাম জানান, রেলওয়ে সমবায় সমিতি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালক কর্তৃক চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে, তাদের ভেতরকার নিয়ম আমার সঠিক জানা নেই অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সিএন/আরইউ

Advertisement