চট্টলা নিউজ ডেস্কঃ চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে অবস্থিত ঐতিহাসিক যাত্রা মোহন সেন হল- সংক্ষেপে জেএম সেন হল। দুর্গাপূজার মহানবমী উপলক্ষে ২০ অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে আলোচনায় এসেছে হলটির ইতিহাস এবং যে ব্যক্তির নামে এর নামকরণ, সেই যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের জীবন ও অবদান।
কিন্তু কে ছিলেন যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত? কেনই বা চট্টগ্রামের ইতিহাসে তাঁর নাম এত গুরুত্বপূর্ণ?
আইনজীবী থেকে জননেতা
যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের জন্ম ১৮৫০ সালের ৩০ জুলাই চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরমা গ্রামে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন খ্যাতনামা আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক। তাঁর বাবা ত্রাহিরাম সেন ছিলেন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক এবং মা মেনকা দেবী।
চট্টগ্রামে প্রাথমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা শেষে তিনি কলকাতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮৭৬ সালে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর চট্টগ্রামে ফিরে আইন পেশায় যুক্ত হন। পেশাগত জীবনে সুনাম অর্জনের পাশাপাশি তিনি জনকল্যাণ, শিক্ষা বিস্তার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৯৮ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। চট্টগ্রাম পৌরসভা, জেলা বোর্ড এবং চট্টগ্রাম কলেজের পরিচালনা কার্যক্রমেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম লক্ষ্য ছিল জনজীবনের উন্নয়ন এবং শিক্ষার প্রসার।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান
শিক্ষা বিস্তারে যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের অবদান উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম শহরে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে তিনি উদ্যোগ নেন এবং তাঁর শ্বশুর ডা. অন্নদাচরণ খাস্তগীরের নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের বিদ্যালয়ের উন্নয়নে জমি ও বাড়ি দান করেন। বরমা গ্রামে তাঁর স্ত্রীর নামানুসারে বিনোদিনী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং নিজের বাবা-মায়ের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত ত্রাহি-মেনকা স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তাঁর সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের অংশ।
এ ছাড়া তিনি নিজ এলাকায় দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিকাশেও তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর উদ্যোগে বাংলা সাহিত্যবিষয়ক সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে নগরীতে সাহিত্যচর্চার প্রসার ঘটে।
কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো জেএম সেন হল?
জেএম সেন হলের ইতিহাসের সঙ্গে যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯১৪ সালে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ এলাকায় টাউন হল নির্মাণের জন্য তিনি জমি কেনেন এবং চট্টগ্রাম অ্যাসোসিয়েশনকে তিন হাজার টাকা অনুদান দেন।
১৯১৬ সালের ১৯ নভেম্বর ভবনটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। তবে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ১৯১৯ সালের ২ নভেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত। পরবর্তী সময়ে তাঁর পুত্র যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত বাবার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে হলটির নামকরণ করেন ‘যাত্রা মোহন সেন হল’। ১৯২০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভবনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
এই হল কেবল একটি মিলনায়তন নয়; এটি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে এ প্রাঙ্গণের সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উঠে এসেছে।
বাবা যাত্রা মোহন, ছেলে যতীন্দ্র মোহন পার্থক্য কি শুধু এতটুকুই?
জেএম সেন হলের ইতিহাস বুঝতে যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত ও তাঁর পুত্র যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের পরিচয়ের পার্থক্য জানা জরুরি।
যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত ছিলেন আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক। অন্যদিকে তাঁর পুত্র দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পরিচিত নেতা। যতীন্দ্র মোহনের স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনজনের নামই চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হলেও তাঁদের অবদান ও পরিচয় এক নয়।
ইতিহাসের প্রাঙ্গণে প্রধানমন্ত্রীর আগমন
শতবর্ষী জেএম সেন হল আজও চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক জীবনের স্মারক। এখানে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দুর্গাপূজার মহানবমীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি আবারও জনআলোচনায় এসেছে।
একদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর, অন্যদিকে যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাঙ্গণ—দুটি বিষয়ই চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের জীবন ও কর্ম স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি শহরের ইতিহাস শুধু তার স্থাপনায় নয়; বরং শিক্ষা, সমাজসেবা, জনকল্যাণ এবং নাগরিক জীবনে অবদান রাখা মানুষদের মধ্যেও বেঁচে থাকে।

















