সরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এখনো প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ে ২০১৩ সালে নিয়োগ পাওয়া চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার বর্তমান ডেপুটি কিউরেটর ডা: শাহাদাত হোসেন তাদেরই একজন। ২০১৩ সালে এই কর্মকর্তা নিয়োগ পান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে, যাহা একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর পদ। এই পদে থেকে জেলা প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সহায়তায় তিনি প্রথম শ্রেণীর পদ ভেটেরিনারি সার্জন হিসেবে পদোন্নতি নিয়েছেন যাহা চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা বিধি বা আইনের পরিপস্থী বলে জানা গেছে।
চিড়িয়াখানার বিধিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ভেটেরিনারি সার্জন পদে কাউকে নিতে হলে তা পত্রিকায় সার্কুলারের মাধ্যমে এবং পরীক্ষা নেয়ার মাধ্যমে নিতে হয়। দ্বিতীয় শ্রেনীর পদ হতে এইভাবে প্রমোশন নিয়ে প্রথম শ্রেণির পদে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদটি দ্বিতীয় শ্রেণীর আর ভেটেরিনারি সার্জন পদটি প্রথম শ্রেণীর মর্যদার বলে জানা গেছে। শুধু এই অনিয়ম নয়, তার বিরুদ্ধে রয়েছে আরও বিস্তর অভিযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিড়িয়াখানার বিধি মোতাবেক উন্নয়ন কাজের ব্যয় ১ লক্ষ টাকার বেশি হলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দরপত্র আহবান করার নিয়ম থাকলেও করোনাকালীন সময়ে প্রায় ৭ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকার কাজ দেখিয়েছেন কোনরকম টেন্ডার ছাড়াই। যা সম্পন্ন করেছেন তারই বাল্যবন্ধু লিটু নামের এক ঠিকাদার। এসব কাজে সে সময় তাকে সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন তারই নিয়োগকৃত মহিন, আতিক, জসিম, লিটন এবং ড্রাইভার রাজু। ধীরে ধীরে এসব সহযোগিদের মাধ্যমেই ডাক্তার শাহাদাত গড়ে তোলেন দুর্নীতির মহা সাম্রাজ্য।
এখনো শেষ নয় ডা: শাহাদাত হোসেন শুভর অনিয়ম ও দুর্নীতির কাহিনী। চিড়িয়াখানার এমন কোন বিষয় নেই যেখানে তার দুর্নীতির ছাপ নেই। পশু খাদ্য ক্রয়, পশুদের ঘর নির্মাণ, চিড়িয়াখানার গাছ কেটে বিক্রি করা সহ যত খাত আছে সব জায়গা থেকেই তিনি টাকা নেন। সিটি কর্পোরেশন করে দেওয়া পাবলিক টয়লেটও বাঁচতে পারেনি তার দুর্নীতির থাবা থেকে। বৈধ ইজারাদারকে হটিয়ে সেখানেও তিনি বসিয়েছেন নিজের লোক। চিড়িয়াখানার ক্রয় বিক্রয়ের প্রতিটি খাতে নিজের লোক লাগিয়ে একটা অংশ নিজে আত্মসাৎ করেন। ক্রয় বিক্রয়ের রশিদ গুলি পর্যালোচনা করলে প্রকৃত সত্য উদযাটিত হবে বলেও জানা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।
জানা যায়, চিড়িয়াখানার উন্নয়নে একটি পরিচালনা কমিটি থাকলেও এই কর্মকর্তার স্বৈরাচারী মনোভাবের কারণে তা আজ বিলুপ্তপ্রায়। উন্নয়ন ব্যয় থেকে অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগের জন্যই তিনি অকার্যকর করে দিয়েছেন এই কমিটি। চিড়িয়াখানার কর্মচারীদের চাকরির অবসরের পর তাদের সন্তানদের চাকরি দেয়ার নামেও এই কর্মকর্তা করেছেন দুর্নীতি। যারা তাকে আর্থিক সুবিধা দিয়েছেন তাদের নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। বৈষম্যের শিকার হয়েছেন হতদরিদ্র অনেক কর্মচারীর সন্তানরাও।
স্থানীয় দোকানিরা বলেন, চিড়িয়াখানায় চাকরি করলেও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের রাজনীতি কন্ট্রোল ছিল সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেল ভক্ত ডা: শাহাদাত হোসেন শুভর হাতে। ছাত্রলীগের রাজনীতিও সে কন্ট্রোল করতো। সকাল থেকে অনেক রাত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে তার এই কর্মকান্ড অব্যাহত থাকতো চিড়িয়াখানা প্রাঙ্গণে। তাদের সাথে অনেক সভা সে চিড়িয়াখানা সভাকক্ষে করেন নিয়মিত।
এদিকে চিড়িয়াখানার সোন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য বিদেশ হতে কোটি টাকা ব্যয় করে অনেক প্রাণি আনা হলেও ইতিমধ্য অনেকগুলোই মারা গিয়েছে বলে জানান চিড়িয়াখানার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা বলেন, এর মধ্যে জেব্রা আনা হয়েছে ৬ টি, –এখন আছে মাত্র ২টি, ওয়াইল্ড বিষ্ট আনা হয়েছে ৮টি, এখন আছে মাত্র ৪টি, ক্যাঙ্গারু আনা হয়েছে ৬টি, এখন আছে মাত্র ৩টি, উট পাখি আনা হয়েছে ৪টি, এখন আছে মাত্র ১টি। এছাড়া ইমু পাখি আনা হয়েছে ৪টি, এখন আছে ৩টি। কিছুদিন আগে একটা বাঘও মারা যায়।
সূত্র জানায়, কুমির প্রজননের জন্য চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার সুনাম থাকলেও বর্তমানে করুন অবস্থা। ২০১৭ সালে সর্বমোট ৩২টি কুমির ছিল, বর্তমানে আছে মাত্র ৬টি। ২৬ টি কুমির গত ৭ বছরে কী কারণে মারা গেছে তার সঠিক তদন্ত এখনো হয়নি। ময়না তদন্ত রিপোর্টে কোনো প্রাণি মারা গেলে তার ময়নাতদন্ত করে একটি রিপোর্ট জেনারেট করে সংরক্ষণ করার নিয়ম। কিন্তু ২৬ টি কুমিরের প্রত্যেকটির ময়না তদন্তের তেমন কোনো রিপোর্ট নেই। নিয়ম হচ্ছে একটা সাধারণ প্রাণি মারা গেলেও তার ময়নাতদন্ত করে রিপোর্ট সংরক্ষণ করতে হয়।
বর্তমানে ডিজিটাল টিকেট থাকলেও একসময় টিকেট ছাপিয়ে বিক্রি করা হতো। সে সময় টিকেটের অনুমোদবিহীন বই ছাপিয়ে বিপুল পরিমান অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন শাহাদাত। ২০১৭ সালের টিকেট বিক্রির ফাইল তদন্ত করলেই পাওয়া যাবে জেলা প্রশাসনের অনুমোদনবিহীন টিকেট ছাপানোর তথ্য। টিকেট ছাপাতে হলে জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নিয়ে কার্যাদেশ দেয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি অনুমোদনবিহীন টিকেট ছাপিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চিড়িয়াখানার প্রাণির খাবার ডেপুটি কিউরেটর তার পছন্দের ২-৩ জন লোক দিয়ে ক্রয় করেন। বাজার থেকে বিভিন্ন ধরণের সবজিসহ মাংশাসী প্রাণীর জন্য যে মুরগি ক্রয় করে আনা হয় তা কখনো ওজন নিয়ে বুঝে নেয়া হয়না। নিয়ম হচ্ছে প্রত্যাকটা খাবার ওজন দিয়ে স্টোরে রাখতে হবে। কিন্তু এইখানেও শুভংকরের ফাঁকি রয়ে গেছে জানান চিড়িয়াখানা সূত্র।
নাম প্রকাশে অনিচছুক চিরিয়াখানার এক কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, মহিবুল ইসলাম নওফেলসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাদের ছত্রছায়ায় স্বৈরাচারী মনোভাবের এই দুর্নীতিগ্রস্ত ডা: শাহাদাত হোসেন অল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। লেক ভিউ আবাসিক এলাকায় করেছেন তিন তলা বাড়ি। কিনেছেন নামে বেনামে সম্পত্তি। ফেসবুক পিন পোস্টে নিজেকে দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে মুদি দোকান উল্লেখ করা এই কর্মকর্তা কিভাবে এত অল্প সময়ে এত সম্পদের মালিক হলেন তা তদন্তের দাবি রাখে। ২০১৩ সালে মাত্র ৭ হাজার টাকা বেতনের চাকরিতে প্রবেশ করেন এই ডাক্তার।
অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার সরকারি নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে সরোয়ার নামের একজন ফোন রিসিভ করে ডা: শাহাদাত হোসেনের নাম্বার পরে দিবে বলে লাইন কেটে দেন।

















