সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জরিপ

চট্টগ্রাম নগরীর ২৫ এলাকা ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’

1211

মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। যার খেসারত দিচ্ছেন নগরবাসী। প্রতিনিয়ত বাড়ছে আক্রান্ত রোগী, কমছে না মৃত্যু। এ পরিস্থিতির মধ্যে চট্টগ্রাম নগরের ২৫ এলাকার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য দিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়।

Advertisement

তাদের পরিচালিত এক জরিপে এসব এলাকা ডেঙ্গুর অন্যতম ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ এলাকাকে অতিঝুঁকিপূর্ণ বলা হচ্ছে। আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৬০ শতাংশই এসব এলাকার বাসিন্দা। এর মধ্যে কয়েকটি আবাসিক এলাকাও রয়েছে।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। এরপরও সিটি করপোরেশন লোক দেখানো কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত মশা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ার শঙ্কা করছে স্বাস্থ্য প্রশাসন।

জরিপের তথ্য বলছে, নগরের ২৫টি এলাকা হলো– বন্দর, কোতোয়ালি, কেপিজেড, হালিশহর, সদরঘাট, বাকলিয়া, বায়েজিদ, পাহাড়তলী, ডবলমুরিং, খুলশী, পাঁচলাইশ, আকবরশাহ, চকবাজার, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ, পাথরঘাটা, লালখানবাজার, আন্দরকিল্লা, কাট্টলী, দেওয়ানহাট, ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, চন্দনপুরা ও মোহাম্মদপুর। এর মধ্যে বন্দর, কোতোয়ালি, কেপিজেড, হালিশহর ও সদরঘাট এলাকাকে অতিঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে।

হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা, পানি, ময়লা-আবর্জনা যেন জমে না থাকে, নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, অক্টোবরের প্রথম ২৫ দিনেই আট শতাধিক ব্যক্তির শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৬৪০ জন, মারা গেছেন ১০ ব্যক্তি। চট্টগ্রামে চলতি বছর এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৩০১ জন, মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মূলত কোন কোন এলাকার বাসিন্দা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করতেই আক্রান্ত রোগীর ওপর জরিপটি করা হয়েছে। সেখানে ২৫ এলাকার বাসিন্দা বেশি আক্রান্ত হওয়ার তথ্য মিলেছে। এসব এলাকায় মশার অত্যাচার বেশি থাকার বিষয়টিও খুঁজে পেয়েছি আমরা। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে সিটি করপোরেশনকে বলা হয়েছে। মশা মারতে না পারলে আক্রান্তের হার আরও বাড়বে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ এস এম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, কয়েক মাস ধরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে নগরবাসীকে রক্ষায় মশা মারার বিকল্প নেই। শিশু ও বয়স্কের দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। কারণ, শিশুদের ডেঙ্গু হলে তা খুব অল্প সময়ের মধ্যে শরীর কাবু করে ফেলে।

জেলা কীটতত্ত্ববিদ মো. মঈন উদ্দীন বলেন, হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত এলাকার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকার প্রমাণ পেয়েছি আমরা। অথচ জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত ক্ষেত্র। অনেক এলাকায় আবার ময়লা-আবর্জনাও পড়ে থাকে দিনের পর দিন। কোন মশা কী ওষুধে মরবে, তা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় ওষুধ ছিটাতে হবে। তবে সিটি করপোরেশনকে সব বিষয় জানানো হলেও সমাধানে নেওয়া হচ্ছে না কার্যকর পদক্ষেপ।

স্বাস্থ্য বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মশা নিধনে সিটি করপোরেশন লোক দেখানো কাজ করছে। তাদের ব্যবহার করা কীটনাশকও অকার্যকর। এ কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে লার্ভার ঘনত্বও। গত বছর নগরে লার্ভার ঘনত্ব ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ, এ বছর সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ দশমিক ২৯ শতাংশে। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার (২০ শতাংশ) চেয়ে চার গুণের বেশি।

এ ছাড়া আইইডিসিআরের সর্বশেষ পরিচালিত এক গবেষণায় মশার অস্তিত্ব বহুগুণ বাড়ার প্রমাণও মিলেছে। এতে সর্বোচ্চ মশার অস্তিত্ব মিলেছে নগরের আগ্রাবাদে, ১৩৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এরপরও দৃশ্যমান নয় চসিকের মশক নিধন কার্যক্রম।

বন্দরের সল্টগোলা এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী মিশমা ইসলাম বলেন, এলাকায় শিশু থেকে বয়স্ক পরিচিত অনেকেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। অথচ গত তিন মাসে মশার ওষুধ ছিটাতে কাউকে দেখিনি।

মোহাম্মদপুর খতিবের হাটের বাসিন্দা আহাদুল হক বলেন, করপোরেশনের অবহেলার খেসারত দিতে হচ্ছে নগরবাসীকে। জবাবদিহি না থাকায় এমনটি হচ্ছে।

Advertisement