চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া টার্মিনাল

ত্রিশ বছরের চুক্তি হচ্ছে ডেনিশ কোম্পানির সঙ্গে

চুক্তি স্বাক্ষর হচ্ছে ১৭ নভেম্বর, ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এপিএম টার্মিনালস

180

চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গায় অবস্থিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব ৩০ বছরের জন্য বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এই দায়িত্ব পাচ্ছে ডেনমার্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস।

Advertisement

আগামী ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপিএম টার্মিনালসের মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। এটি নির্মাণে এপিএম বিনিয়োগ করবে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার মতো। এটি দেশে বেসরকারি খাতে এ পর্যন্ত এককভাবে সর্বোচ্চ বিদেশি বিনিয়োগ। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এই তথ্য প্রকাশ করেন। ‘গ্রিন পোর্ট’ হিসাবে এটি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে তুলে না দেওয়ার দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বস্তরের কর্মচারী এবং বাম রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন করে আসছে। মশাল মিছিল, মানববন্ধন, বন্দর ঘেরাওসহ ধারাবাহিকভাবে নানা কর্মসূচি পালন করছে সংগঠনগুলো। এর মধ্যেই লালদিয়ার চর কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তির সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা জানালেন সরকারপ্রধান।

অন্যদিকে মঙ্গলবার জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) আগামী ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরের আশপাশে সব ধরনের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার না থাকলে চুক্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকেই দ্রুততার সঙ্গে বন্দরের স্থাপনায় বিদেশি বিনিয়োগের চুক্তি সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে সূত্র জানায়। কেবল লালদিয়ার চর নয়, চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, পানগাঁও নৌ টার্মিনালসহ অন্যান্য টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বও বিদেশি আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া জোরেশোরে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এসব চুক্তি সম্পন্ন করা হবে বলে সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে।

যদিও আন্দোলনকারীরা বলছেন, এভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের সব স্থাপনা বিদেশিদের হাতে তুলে দিলে তাতে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারে। দেশের স্বার্থ ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যেসব বিষয়ে রয়েছে, সেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। এরপরও জনদাবিকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার দেশবিরোধী চুক্তি করছে।

লালদিয়ার চরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী বলেন, এপিএম টার্মিনালস এই প্রকল্পের নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনা করবে।

বন্দরটির মালিকানা থাকবে চট্টগ্রাম বন্দরের হাতেই। এই টার্মিনালে বছরে ৮ লাখ টিইইউএস (২০ ফুট সমমানের) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে। অর্থাৎ বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা আরও ৮ লাখ টিইইউএসে দাঁড়াবে। এখানে ৫০০ থেকে ৭০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলেও জানানো হয়।

২০২৯ সালে এই টার্মিনাল চালুর টার্গেট রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) আওতায় জি-টু-জি ভিত্তিতে (সরকারি পর্যায়ে) লালদিয়ার চর টার্মিনাল ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং কোম্পানি মায়ের্সলাইনের মালিকানাধীন এপিএম টার্মিনালসকে দেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে কনসেশন চুক্তিটি হবে ৩৩ বছরের। এটি নির্মাণে তিন বছর সময় লাগতে পারে। নির্মাণের পর যেদিন থেকে চালু হবে, মূলত সেদিন থেকে ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এপিএম। শর্ত পূরণ করা হলে তারা পরবর্তী আরও ১৫ বছর চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে পারবে। লালদিয়ায় যেসব সেবা দেওয়া হবে তার বিপরীতে মাশুল আদায় করবে এপিএম টার্মিনালস। তারা যা আদায় করবে, সেখান থেকে একটি অংশ চট্টগ্রাম বন্দরকে দেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, লালদিয়ার চরে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ডেনমার্কভিত্তিক ইউরোপীয় ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ জরিপ করেছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েই চুক্তিটি করতে যাচ্ছে।

একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান ও কার্যকর এনসিটি বা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালটিও দুবাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপারেটর কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বিগত সরকার। সেই প্রক্রিয়াটিও বর্তমান সরকার আসার পর গতি বাড়িয়ে চুক্তির পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

Advertisement