চট্টগ্রাম সিটি কলেজে দফায় দফায় শিবির-ছাত্রদলের সংঘর্ষে আহত ২০

33

চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে একটি গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ লেখার জেরে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

Advertisement

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দুই দফায় সংঘর্ষ চলে। এ সময় ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা হাতে উভয় পক্ষের কর্মীদের দেখা গেছে। ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে দুই পক্ষই দাবি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলেজ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

কলেজ সূত্র জানায়, ক্যাম্পাসের একটি গ্রাফিতির নিচে লেখা ছিল ‘ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’। পরবর্তীতে কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী সেখানে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে তার ওপর ‘গুপ্ত’ লিখে দেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত আইডিতে প্রচার করেন আল মামুন। বিষয়টি নিয়ে ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে মঙ্গলবার দুপুরে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়ায়।

দুপুরের দিকে সংঘর্ষ শুরু হলে কলেজ প্রশাসন ও পুলিশ দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। তবে বিকেল চারটার দিকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা হামলার প্রতিবাদে নিউমার্কেট মোড় থেকে মিছিল নিয়ে কলেজের দিকে অগ্রসর হলে পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হয়। বিকেল পাঁচটার দিকেও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কলেজের সামনে এবং শিবিরের নেতাকর্মীরা নিউমার্কেট মোড় এলাকায় অবস্থান করছিলেন।

সরকারি সিটি কলেজের উপাধ্যক্ষ জসীম উদ্দিন দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, গ্রাফিতির লেখা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ডাকা হয়। পরে কলেজের সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

দুপুরের পর কিছুটা শান্ত হলেও পরে ছাত্রশিবির বিক্ষোভ মিছিল বের করলে আবার উত্তেজনা ছড়ায়। বিকেল চারটার দিকে নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে শিবিরের মিছিল কলেজের দিকে এলে সিটি কলেজের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ধাওয়া দেন। এতে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, সংঘর্ষের সময় আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। কলেজের সামনে ছাত্রদল এবং নিউমার্কেট এলাকায় শিবিরের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র এবং অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা গেছে।

ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম নগর দক্ষিণ শাখার প্রচার সম্পাদক জাহিদুল আলম দাবি করেন, তাঁদের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাহাড়তলি ওয়ার্ড শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ আশরাফের অবস্থা গুরুতর এবং তার পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আশরাফকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে সিটি কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল সিদ্দিকী রনির মোবাইল ফোনে কল করা হলে অন্য একজন রিসিভ করে বলেন, ‘কলেজে মারামারি হয়েছে। রনি ভাই আহত হয়েছেন, তাকে পাচ্ছি না।’

হামলার বিষয়ে কলেজ ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন, ‘আদর্শিকভাবে দেউলিয়া ছাত্রদল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আদর্শিক লড়াইয়ের পরিবর্তে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে।’

তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রাফিতি মুছে “গুপ্ত” লেখা হয়েছে। তারা যদি গুপ্ত না হয়, তাহলে তাদের কেন গায়ে লাগল!’

সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা নিউমার্কেট মোড়ে জড়ো হন। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে কলেজের সামনে অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন স্লোগান দেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে তাঁদের অবস্থান দেখা গেছে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন বলেন, দুপুরের ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম জানান, সামি মো. আলাউদ্দিন নামের এক শিক্ষার্থীকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর মাথায় সেলাই দেওয়া হয়েছে। পরে পরিবার তাঁকে বাসায় নিয়ে গেছে।

১৯৫৪ সালে চট্টগ্রাম নাইট কলেজ নামে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ক্যাম্পাস কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ক্যাম্পাসটি রাজনীতিমুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সে বছর কমিটি দেয় ইসলামী ছাত্রশিবির। আগে কমিটি থাকলেও ৫ আগস্টের পর সক্রিয় হয় ছাত্রদলও। ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব রয়েছে।

Advertisement