ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদন

পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ ও জন-আকাঙ্ক্ষার মুখে বিএনপি সরকার

29

প্রায় দুই দশক পর অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনকাল শেষে গত ১২ ফেব্রুয়ারি এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

Advertisement

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিলেও নতুন সরকারকে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ ও জন-আকাঙ্ক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ এই মত দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিএনপিকে এখন বহুমাত্রিক কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি এবং আশু কাজ হলো দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ বর্তমান পরিস্থিতিকে নাজুক করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব, যার ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলা করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও শিল্প-বাণিজ্য খাতকে সচল রাখাই হবে সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা।

ক্রাইসিস গ্রুপ আরও জানায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি ছাড়া এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন হবে। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদার করা, দুর্নীতি দমন এবং বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এছাড়া নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটে পাস হওয়া ‘জুলাই সনদ’ বা সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত এড়িয়ে সমঝোতার পথ খুঁজতে বিএনপিকে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সরকারকে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা দেশে নতুন করে অস্থিরতা ও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। একইসাথে প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নিরপরাধ রাজনৈতিক কর্মীদের হয়রানি বন্ধের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও সরকারকে এক কঠিন কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। প্রতিবেদনে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গত দেড় দশকের তিক্ততা কাটিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মতো অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলো সমাধান করা এক বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এছাড়া মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের প্রভাবে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সবশেষে ক্রাইসিস গ্রুপ সতর্ক করেছে যে, নির্বাচনের পরবর্তী এই ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বা স্বল্প সময়ের সুযোগ কাজে লাগিয়ে যদি সরকার দ্রুত সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পারে, তবে জন-অসন্তোষ পুনরায় তীব্র হতে পারে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী এই বাংলাদেশে জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে দেশ আবারও নতুন কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতার আবর্তে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সুত্র: ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ

Advertisement