উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ: ডিসি জাহিদ

97

আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আবারও ব্যতিক্রমী আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো জেলা প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবসায়ীদের প্রতি উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যছাড় চালুর আহ্বান জানালেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু আহ্বানেই থেমে থাকেননি তিনি—তার এই মানবিক উদ্যোগে ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাও।

Advertisement

জেলা প্রশাসকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আগামী সোমবার (১৮ মে) খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঈদ উপলক্ষে অন্তত তিন দিনের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মূল্যছাড় দেওয়ার ঘোষণা দেবেন বলে জানা গেছে। দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে অনেকেই “মানবিক বাজারব্যবস্থার নতুন অধ্যায়” হিসেবে দেখছেন।

উল্লেখ্য, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এর আগে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও ব্যবসায়ীদের প্রতি একই ধরনের মানবিক আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে এবার চট্টগ্রামে বিষয়টি আরও বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দিন বাজারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসব এলেই পণ্যের দাম কমে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোতে উৎসব উপলক্ষে “ফেস্টিভ সেল” বা বিশেষ মূল্যছাড় সাধারণ সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে উল্টো চিত্র দেখা যায়—উৎসব এলেই বাড়তে থাকে নিত্যপণ্যের দাম। সেই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে মানবিক ও দায়িত্বশীল বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক রাজধানী। চট্টগ্রামকে ঘিরেই দেশের বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে, যার প্রভাব আজ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। তাই আমরা চট্টগ্রাম থেকেই একটি নতুন মানবিক বার্তা দিতে চাই।”

তিনি বলেন, “আমরা চট্টগ্রাম থেকেই এই স্লোগানটা শুরু করতে চাই যে, চট্টগ্রামেও উৎসবকে ঘিরে আমাদের সেই রেশনাল একটা আচরণ হবে, যাতে সকল পর্যায়ের মানুষ উৎসব করতে পারে।”

জেলা প্রশাসক বলেন, উৎসবের প্রকৃত দর্শন হচ্ছে সর্বজনীন অংশগ্রহণ। “উৎসবের ধারণাটাই এমন যে সেখানে সকল স্তরের, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ সেটার সাথে সম্পৃক্ত থাকবে। কিন্তু যখন উৎসবকে কেন্দ্র করে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। কিছু গোষ্ঠী যখন উৎসব উদযাপন করে আর কিছু গোষ্ঠী যখন করতে পারে না, তখন সেটাকে সামগ্রিক উৎসব বলা যায় না।”

তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্বে মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে কখন “ক্রিসমাস সেল” শুরু হবে। কারণ তখন নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত—সব শ্রেণির মানুষ স্বস্তি নিয়ে কেনাকাটা করতে পারে। বাংলাদেশেও সেই সংস্কৃতি চালুর সময় এসেছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, নতুন সরকার একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী উৎসবকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত মুনাফার আশায় নিত্যপণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, “উৎসব আসলে জিনিসের দাম বাড়বে না, উৎসব আসলে জিনিসের দাম কমবে—এবং এই ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম হবে পাইওনিয়ার।”

খাতুনগঞ্জ ও রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীদের অন্তত তিন দিনের জন্য পণ্যের দাম কমানোর আশ্বাসকে স্বাগত জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “চট্টগ্রাম দেখিয়ে দিয়েছে যে সাধারণ মানুষের পাশে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আছে।”

সভায় জেলা প্রশাসক বাজার ব্যবস্থার নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি পণ্য আমদানির পর ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে তিন-চারটি হাত ঘুরতে হয়। একজন আমদানিকারক, এরপর পাইকার, তারপর আরও কয়েকজন মধ্যস্বত্বভোগী ঘুরে পণ্য খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে আসে। ফলে আমদানিতে সামান্য দেরি হলেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় এবং দাম বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আগাম টাকা দেওয়ার পরও বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী এক জায়গা থেকে কিনে আরেক জায়গায় বিক্রি করেন। অথচ আমদানিকারকদের কাছ থেকে যদি সরাসরি খুচরা ব্যবসায়ীরা পণ্য পাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ কমবে এবং বাজারও স্থিতিশীল থাকবে।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, তারা ব্যবসায়ীদের লোকসান করতে বলছেন না। বরং একজন ব্যবসায়ী যদি একটি পণ্যে এক টাকা লাভ করেন, তাহলে ঈদ উপলক্ষে সেই লাভের একটি অংশ কমিয়ে এক টাকা বা দুই টাকা ছাড় দিলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। এতে ব্যবসায়ীরও বড় ক্ষতি হবে না, বরং ক্রেতা বাড়বে।

তিনি আহ্বান জানান, অন্তত ঈদের আগের তিন দিনের জন্য হলেও বিশেষ মূল্যছাড় চালু করতে। এতে একটি নতুন সংস্কৃতি তৈরি হবে এবং মানুষের মধ্যে যে ধারণা রয়েছে—উৎসব এলেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ে—সেখান থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হবে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, সেটিও কমাতে হবে। অতিরিক্ত চাপ, বেপরোয়া যাতায়াত ও অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতার কারণে রাস্তায় অনেক প্রাণ ঝরে যায়। অথচ সেই গাড়ির ভেতরে সবারই সন্তান, পরিবার ও স্বজন থাকে। তাই সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রচার চালানো হবে। মাইকিং হবে, ভিডিও বার্তা প্রচার করা হবে। ব্যবসায়ীরাও যদি সামনে এসে বলেন—“আমরা তিন দিনের জন্য হলেও কিছু পণ্যে ছাড় দিচ্ছি”—তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যাবে।

সভায় উপস্থিত এক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি বলেন, জেলা প্রশাসকের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। অন্তত তিন দিনের জন্য হলেও যদি এক টাকা বা দুই টাকা কমানো যায়, তাহলে খুচরা বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আরেক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি বলেন, বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ ও খাতুনগঞ্জের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে তারা অভ্যন্তরীণভাবে বসবেন। তবে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হলে এর প্রভাব আরও ভালো হবে বলে তিনি মনে করেন।

সভায় আরও প্রস্তাব আসে, দোকানে আগের দাম ও বর্তমান ছাড়মূল্য একসঙ্গে লিখে প্রদর্শন করলে ক্রেতারা বুঝতে পারবেন তারা কতটুকু ছাড় পাচ্ছেন। এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ক্রেতাদের আস্থাও তৈরি হবে।

একজন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি বলেন, “একজন যদি উদাহরণ তৈরি করেন, তাহলে অন্যরাও অনুসরণ করবেন। এক টাকার মুনাফা থেকে ৫০ পয়সা ছাড় দিলে ব্যবসায়ীর খুব বেশি ক্ষতি হবে না, কিন্তু সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।”

সভায় কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধিরা বলেন, রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে যেন কোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। অবৈধ মজুত বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে যাতে মানহীন পণ্য না পৌঁছায়, সে বিষয়েও ব্যবসায়ী নেতাদের নজরদারি বাড়াতে হবে।

তারা বলেন, সমাজের উচ্চবিত্তরা হয়তো এসব সমস্যা সরাসরি অনুভব করেন না। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীরা প্রায়ই নিম্নমানের পণ্যের শিকার হন। তাই ব্যবসায়ী সমাজ যদি এই জায়গায় দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়, তাহলে সেটি সাধারণ মানুষের জন্য বড় উপহার হবে।

সভায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তারা বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম একটি নতুন মাইলফলক স্থাপন করতে পারে।

শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “আজ আমরা প্রত্যয় ব্যক্ত করছি—চট্টগ্রাম থেকেই একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এখানে উৎসব এলে পণ্যের দাম বাড়বে না, বরং কমবে। আর এই উদ্যোগে চট্টগ্রামই হবে পথপ্রদর্শক।”

Advertisement