ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস আজ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে এশিয়া-আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর- শতাব্দীর মহাপুরুষ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজশাহী শহরের মাদ্রাসা ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন। সেদিন সকাল ১০টায় লাখো জনতার পদযাত্রা শুরু হয়েছিল মাদ্রাসা ময়দান থেকে। পরদিন ১৭ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে পৌঁছে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে মজলুম জননেতা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ এক আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না, কারো হুমকিকে পরোয়া করে না’। তিনি আরও বললেন, ‘আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে যে ইতিহাস শুরু হলো তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির রুখে দাঁড়ানোর জ্বলন্ত নজির’। মওলানা ভাসানী তার জ্বালাময়ী ভাষণের একপর্যায়ে পদ্মার উজানে ভারতের দেয়া ফারাক্কা বাঁধকে বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদ বলে উল্লেখ করতেই উপস্থিত লাখো জনতার স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সভাস্থল। মুহুর্মুহু আওয়াজ ওঠে, ‘ভেঙে দাও-গুঁড়িয়ে দাও/মরণ বাঁধ ফারাক্কা’।
সেদিনের ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ ষোলআনা সফল হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবের বিষয়গুলো তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল। তৎকালীন ভারত সরকার বাধ্য হয়েছিল ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টন বিষয়ক একটি পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি করতে। একটি স্বাধীন ও স্বার্বভৌম দেশ হিসেবে ১৯৭৭ সালের গঙ্গা চুক্তিটি ছিল সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য। কোনো কারণে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির পরিমাণ কমে এলে বাংলাদেশ তার প্রাপ্য অংশের ৮০ ভাগ পানি অর্থাৎ ২৭ হাজার ৬০০ কিউসেক পানি পাবে। এটি ছিল চুক্তির গ্যারান্টি ক্লজ। এরপরে ১৯৮২ সালে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের শাসনকালে গঙ্গার পানি নিয়ে চুক্তিটি নবায়ন না হয়ে একটি সমঝোতা স্মারকপত্র স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতা স্মারকে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ ছিল না। ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে নদী কমিশনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল নেপালকে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নদী কমিশন গঠনের। ১৯৮২ সালের সমঝোতা স্মারকে সেটিও বাদ দেয়া হয়। রাজশাহীর পদ্মার তীরে শ্রীরামপুর এলাকায় বাস করেন আলতাফ হোসেন। ছোটবেলা থেকে নৌকায় ভেসে ভেসে মাছ ধরেন পদ্মায়। কিশোর বয়সে ভাসানীর লংমার্চে তিনিও যোগ দেন। পদ্মায় বসে তিনি বললেন, এখনও মনে হয় ভাসানীর লংমার্চের দাবিই সঠিক ছিল। এই ফারাক্কার কারণে সব শেষ হয়ে গেল। নদীতে পানি নাই, মাছ নাই। মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে গোটা এলাকা।
ফারাক্কা বাঁধের ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের নদ-নদী ও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীর উদ্বেগের বিষয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এ বাঁধটি অবস্থিত। ১৯৬১ সালে এ বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৭৫ সালে। সেই বছর ২১ এপ্রিল থেকে বাঁধ চালু হয়। ফারাক্কা বাঁধ ২ হাজার ২৪০ মিটার (৭ হাজার ৩৫০ ফুট) লম্বা যেটা প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় বানানো হয়েছিল। যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য উদ্বেগের বড় কারণ। ফারাক্কা পয়েন্টে ভারত পানি সরিয়ে নেয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় মারাত্মক পানি সংকট তৈরি হচ্ছে। এক সময়ের খরস্রোতা প্রমত্তা পদ্মার বুকে বিশাল চর জেগেছে, নদীর গতিপথ সংকীর্ণ হয়ে গেছে, নদীটিই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আবার বর্ষাকালে সেই ফারাক্কারই সবগুলো গেট খুলে দেয়া হচ্ছে। এরে ফলে প্রায় প্রতিবছরই গঙ্গা ও পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বন্যা ও ভাঙনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পদ্মা নদী। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এ নদ ভারত থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
ফারাক্কার সরাসরি শিকার রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ। বিগত ৫০ বছরের মধ্যে এই দুই অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা নদী উল্লেখযোগ্য হারে সংকুচিত হয়েছে। পানির প্রবাহ কমে আসায় নদীর তলদেশ পলি ও বালির দ্বারা ক্রমান্বয়ে ভরাট হতে চলেছে। জলজ প্রাণী বিশেষ করে কয়েক প্রজাতির যায় ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গঙ্গার ডলফিন ও ঘড়িয়ালের দেখা মিলছে না। পদ্মায় রূপালী ইলিশের ঝাঁক নেই। মহাবিপর্যয়কর অবস্থায় গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার প্রাণবৈচিত্র্য। সরাসরি নদীকেন্দ্রিক পেশা হারানো মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। তাদের মধ্যে মৎসজীবী, নৌজীবী মানুষের সংখ্যাই বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণের সুন্দরবনে মিঠাপানির সরবরাহ আশঙ্কাজনক হারে কমতে থাকায় সুন্দরী গাছসহ আরও কয়েক প্রজাতির গাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারিতে গঙ্গায় পানি প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ৭৩০ কিউসেক। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারিতে পানি প্রবাহের পরিমাণ ছিল ৭৫ হাজার ৪০৯ কিউসেক। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে গঙ্গায় পানি প্রবাহ করেছিল ১৫ হাজার কিউসেক। যদিও সে বছর গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় ১৯ দশমিক ২ শতাংশ কম।
ফারাক্কা লং মার্চের ৫০ বছর উদযাপন কমিটির দেয়া তথ্য মতে, ভারত জাতিসংঘ প্রণীত পানি বিষয়ক কোনো ধরনের সনদ, আইন বা নীতি না মেনে একক ইচ্ছায় কাজ করে চলেছে। এখন অবধি ভারত গঙ্গাসহ শতাধিক অভিন্ন নদীর পানি অন্যায়ভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এর ফলে ভাটিতে থাকা বাংলাদেশের নানামুখী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষ সেচের পানির স্বল্পতায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বসবাসরত প্রায় ৪ কোটি মানুষ সেচের পানির অপ্রতুলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের সবচেয়ে বড় গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রজেক্টে পানি স্বল্পতার কারণে প্রায় ৭০ ভাগ এলাকায় সেচ প্রদান ব্যাহত হচ্ছে। উজান থেকে স্বাদুপানির সরবরাহ বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ কমতে থাকায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে। ইদানিং মাদারীপুর পর্যন্ত এর বিরূপ প্রভাব পৌঁছে গেছে। পাশাপাশি জমির উর্বরতা শক্তি কমে আসছে।
এছাড়া বিশাল বরেন্দ্র অঞ্চলের গভীর নলকূপগুলোর প্রায় শতভাগ অকোজো হয়ে গেছে। প্রায় ২১ শতাংশ অগভীর নলকূপ অকার্যকর অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আর্সেনিকের বিষাক্ত প্রভাবে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলার নলকূপের পানি পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফারাক্কার প্রভাবে গঙ্গা-পদ্মাসহ এর অসংখ্য শাখা-প্রশাখা নাব্যতা হারিয়েছে। বিগত ৪৫ বছরে এ অঞ্চলের প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার নদীপথের নাব্যতা আর নেই। স্বাদু পানির অভাবে সুন্দরবনের বুড়ীগোয়ালিনী রেঞ্জ ও খুলনা রেঞ্জের বনভূমির প্রাণবৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ফারাক্কা লং মার্চের ৫০ বছর উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ৩০ বছরের গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হবে। এখনই সময় এই চুক্তির মূল্যায়ন করা। এর জন্য শক্তিশালী বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কমিটি গঠন জরুরি। নতুনভাবে গঙ্গা চুক্তির জন্য হালনাগাদ তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে হোমওয়ার্ক সম্পন্নপূর্বক পূর্নাঙ্গ প্রস্তুতি গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির অনুরূপ গ্যারান্টি ক্লজ অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গঙ্গা শুধুমাত্র বাংলাদেশ এবং ভারত এই নদীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। নেপাল থেকে অনেকগুলো নদী এসে গঙ্গায় মিশেছে যার মধ্যে ৫টি নদীর পানি দ্বারা গঙ্গা বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। এছাড়া চীনের তিব্বত থেকে দুইটি বৃহৎ নদী উৎপন্ন হয়ে নেপালের মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে। কাজেই যৌক্তিকভাবে নেপাল এবং চীন গঙ্গার সঙ্গে সম্পৃক্ত। নতুনভাবে গঙ্গা চুক্তির জন্য যে যৌথ কমিশন গঠিত হবে তাতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং চীনের সমন্বয়েই হতে হবে। ভারত দ্বিমত পোষণ করলে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্তিও প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াবে।
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক পানি বিষয়ক সনদটি শতভাগ আইনে পরিণত হয়েছে। এই আইন ভাটির দেশের স্বার্থ রক্ষা করছে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে এই আইনের সুবিধা পাবে শতভাগ। অতএব কালক্ষেপণ না করে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত এই আইনে স্বাক্ষর করা বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থে একান্তই জরুরি। বর্তমান সরকারের উচিত জাতির স্বার্থে কালবিলম্ব না করে এই আইনের পক্ষে স্বাক্ষর করা। এটি না হলে বাংলাদেশ ফারাক্কার সমস্যা বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করার অধিকার নৈতিকভাবেই হারিয়ে ফেলবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে।

















