পুলিশে ব্যাচভিত্তিক গ্রুপিং, ‘ট্যাগিং’ আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব

34

পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ব্যাচভিত্তিক গ্রুপিং, ‘ট্যাগিং’, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে অসন্তোষ নতুন করে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে হামলার শঙ্কা, বাধ্যতামূলক অবসর নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ মিলিয়ে বাহিনীর বড় অংশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে পূর্ণ শক্তিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এই বাহিনী।

Advertisement

৫ আগস্ট-পরবর্তী বাস্তবতায় পুলিশ বাহিনীর বড় একটি অংশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেউ আতঙ্কে দায়িত্ব পালন করছেন, কেউ ওএসডি কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরের শঙ্কায় রয়েছেন। বাহিনীর ভেতরে পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে চাপা ক্ষোভের পাশাপাশি ব্যাচভিত্তিক গ্রুপিং, ‘ট্যাগিং’ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে পদক স্থগিত, এসপি পদায়ন বাতিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন অনিশ্চয়তায় পড়ে যাওয়ার বিষয়।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও অবসর, সবই আইন অনুযায়ী হচ্ছে। বাধ্যতামূলক অবসর প্রসঙ্গে তার ভাষ্য, বিভাগীয় যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যাতে কারও প্রতি অবিচার না হয়।

অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে বিক্ষুব্ধ জনতার তোপের মুখে পড়ে পুলিশ। এর এক দিন আগে রাজধানীর পল্লবীর বাউনিয়াবাঁধে অভিযানে গিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। হামলায় অন্তত ১০ সদস্য আহত হন। এর আগে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে ছিনতাই তদন্তে গিয়ে হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। এক কনস্টেবলের দুই আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আহত হন এক এএসআই। ছিনিয়ে নেওয়া হয় সরকারি শটগান। গাজীপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাব-পুলিশের ওপর হামলা, রাজবাড়ীতে ডিবি পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া এবং সাভারে নারী কনস্টেবলকে লোহার রড দিয়ে পেটানোর ঘটনাও বাহিনীর ভেতরে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিমত, এখনো অভিযানে গেলেই ‘মব সন্ত্রাসের’ আশঙ্কা থাকে। রাজধানীর রমনা বিভাগের কয়েকজন উপপরিদর্শক বললেন, ‘৫ আগস্টের পর জনগণের আচরণ বদলে গেছে। অভিযানে গেলে কখন কী হয়, সে শঙ্কা কাজ করে। আবার ভেতরেও একধরনের চাপ আছে। কেউ কারও দায় নিচ্ছে না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘এএসআই’ পদে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এবং পরিদর্শক থেকে সহকারী পুলিশ সুপার পদে বিভাগীয় পদোন্নতির ৩৩ শতাংশ কোটা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন কয়েক দফা বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তরকে জানিয়েও সমাধান পায়নি।

এদিকে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় এখন পর্যন্ত ৭৯ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আগামী ৩১ মে ২০ ব্যাচের কর্মকর্তাদের ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই ব্যাচ থেকে আরও ৪৫ জনকে অবসরে পাঠানোর তালিকা তৈরি হচ্ছে, এমন গুঞ্জনও রয়েছে।

বাহিনীর ভেতরের অস্বস্তির আরেকটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক ‘পুলিশ সপ্তাহ’। ‘বিপিএম’ ও ‘পিপিএম’ পদকের জন্য ১০৭ কর্মকর্তার নাম ঘোষণা করা হলেও আগের রাতে তা স্থগিত করা হয়। এ ঘটনায় বাহিনীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়। অভিযোগ ওঠে, তালিকা প্রণয়ন ও যাচাই প্রক্রিয়ায় অসংগতি ছিল।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন বলেছেন, পদক এবং এসপি পদায়ন নিয়ে কিছু ঝামেলা হয়েছিল। তবে সবকিছুই দ্রুত ঠিক হয়ে যাবে। ৩০ ব্যাচের পদোন্নতির বিষয়টিও দ্রুত সুরাহা হবে। অস্থিরতার বিষয়টি ঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।

র‌্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ জানান, পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে। তবে অনেক উন্নতি হয়েছে।

পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, বর্তমানে আইজিপি, এসবিপ্রধান, র‌্যাব মহাপরিচালক, সিআইডিপ্রধান, পিবিআইপ্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তারা। ১৭ ব্যাচের মাইনুল হাসানকে ৫ আগস্টের পর চলতি দায়িত্বে ডিএমপি কমিশনার করা হলেও কয়েক মাসের মধ্যেই সরিয়ে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত আইজিপি পদেও ওই ব্যাচ থেকে কাউকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এসব বিষয়ও বাহিনীর ভেতরে ব্যাচভিত্তিক অসন্তোষ ও বিভাজনের আলোচনাকে সামনে এনেছে।

এদিকে, সম্প্রতি অতিরিক্ত ডিআইজি (কল্যাণ) আহমদ মুঈদের দেহরক্ষী শাকিল হাসানকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে আইসোলেশনে রাখার বিষয়টি নিয়ে বাহিনীতে নতুন অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অতিসম্প্রতি পঞ্চগড়ে মিজানুর রহমান, মৌলভীবাজারে রিয়াজুল ইসলাম এবং ফেনীতে মাহবুব আলম খানকে এসপি হিসেবে পদায়নের পর সেই আদেশ বাতিল করে পুলিশ সদর দপ্তর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপে এমন সিদ্ধান্তে বাহিনীর ভেতরে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাহবুব আলম খানের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ করেন মো. আয়নাল হক নামে এক ব্যক্তি। তার অভিযোগ ছিল, ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট তার ছেলে মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজানকে গুম করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম খান। তার দাবি করা ২০ লাখ টাকার ১২ লাখ দেওয়া হলেও ছোট মিজানকে গুম করা হয়। এই ছোট মিজানই ছিলেন বহুল আলোচিত হলি আর্টিসান হামলা মামলার চার্জশিটভুক্ত ১২ নম্বর আসামি।

মাহবুব আলম খান বলেছেন, ‘আয়নাল হক যখনকার কথা বলে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তখন আমি (২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ঢাকায় পুলিশ স্টাফ কলেজে ৩০তম পুলিশ ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করছিলাম।’

দীর্ঘদিনের আলোচনায় থাকা স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনও এখনো অনিশ্চিত। কমিশন অধ্যাদেশের ১২ ধারায় আইজিপি নিয়োগে কমিশনের সুপারিশের বিষয়টি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। এ নিয়েও বাহিনীর মধ্যে অস্বস্তি রয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, পুলিশের ভেতরে পেশাদারত্ব, সমন্বয় ও নৈতিক মনোবলের সংকট এখন স্পষ্ট। সরকার বা ব্যক্তিবিশেষকে খুশি করার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ কিংবা যাচাই ছাড়া কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া বাহিনীর শৃঙ্খলার দুর্বলতা প্রকাশ করে।

Advertisement