অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও লেনদেনের মাধ্যমে সম্ভাব্য কারসাজির অভিযোগে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিনটি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিগুলো হলো রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিলস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিএনআইসিএল) এবং সোনারগাঁও টেক্সটাইলস লিমিটেড।
বিএসইসির সার্ভেইলেন্স বিভাগ থেকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) পৃথক তিনটি চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছে কমিশন।
গত মাস থেকে এসব কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বড়ছিল। বিএসইসির পর্যবেক্ষণেও কোম্পানিগুলোর শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্য পরিবর্তন ও লেনদেনের আচরণ ধরা পড়েছে। এ কারণে ডিএসইকে বিস্তারিত তদন্ত করে সম্ভাব্য কারসাজি, সমন্বিত বা কৃত্রিম লেনদেন এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
তদন্তের আওতায় সমন্বিত বা অপ্রকৃত লেনদেন হয়েছে কি না, অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করে ইনসাইডার ট্রেডিং সংঘটিত হয়েছে কি না, মার্জিন ঋণ সংক্রান্ত বিধি ও কমিশনের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট স্টক ব্রোকার, স্টক ডিলার ও তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধিদের (এআর) ভূমিকা এবং অন্য কোনো অনিয়ম বা আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে কি না এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
শ্যামপুর সুগার মিলসের ক্ষেত্রে তদন্তে বিশেষভাবে বারাকা সিকিউরিটিজ লিমিটেড ও স্মার্ট শেয়ারস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ভূমিকা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে কি না বা কোনোভাবে সহায়তা করেছে কি না, তাও তদন্তের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্টক ব্রোকার ও স্টক ডিলারদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা এবং অনুমোদিত প্রতিনিধিদের সন্দেহজনক লেনদেন বিষয়ে সচেতনতা তৈরির নির্দেশও দিয়েছে বিএসইসি।
কমিশনের মতে, এ ধরনের লেনদেন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০ এর বিধান লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে।
লোকসানী সোনারগাঁও টেক্সটাইল একমাসে দ্বিগুণ দামে
এদিকে ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, লোকসানী সোনারগাঁও টেক্সটাইলের শেয়ারদর এক মাসে দ্বিগুণ হয়েছে। গত ১৭ মে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ৪০ টাকা ১০ পয়সা। এক মাসেরও কম সময় পর আজ মঙ্গলবার তা বেড়ে ৮৪ টাকায় পৌঁছেছে। কোম্পানিটির শেয়ারদরের কারণ জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল ডিএসই। তবে গত ২ জুন কোম্পানিটি জানায়, সাম্প্রতিক দর বৃদ্ধি ও লেনদেনের পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য নেই।
কোম্পানিটির আর্থিক চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটি ৫০ লাখ টাকা লোকসান করেছে। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১৯ পয়সা। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি ২ কোটি ১৩ লাখ টাকা লোকসান করে। ফলে ওই বছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল কোম্পানিটি। এর আগে ২০১৯ সালে মাত্র ৩ শতাংশ এবং ২০২২ সালেও ১ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে।
২৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে সোনারগাঁও টেক্সটাইলের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা। ১৯৯৫ সালে তালিকাভুক্ত বি ক্যাটাগরির সোনারগাঁও টেক্সটাইলের উদ্যোক্তা পরিচালকদের মালিকানায় ৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ শেয়ার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অধীনে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৫১ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
বন্ধ শ্যামপুর সুগার মিলেও অস্বাভাবিক উত্থান
দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ ও জেড ক্যাটাগরির রাষ্ট্রায়ত্ত শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ারদর গত ১৭ মে ১৩৯ টাকা ২০ পয়সা ছিল। কয়েকদিনের ব্যবধানে শেয়ারটির দর বেড়ে গত ১১ জুন ২৩৮ টাকা ৯০ পয়সায় ওঠে যায়। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে এদিন শেয়ারটির লেনদেনও স্থগিত করেছিল ডিএসই। যদিও আজ মঙ্গলবার লেনদেন শেষে এটি ১৯৬ টাকা ৬০ পয়সায় নেমে এসেছে।
এর আগে দর বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে গত ৮ জুন চিঠি দেয় ডিএসই। ১০ জুন চিঠির জবাবে কোম্পানিটি জানায়, দর বৃদ্ধি ও লেনদেনের পেছনে কোনো অপ্রকাশিত মূল্যসংবেদনশীল তথ্য নেই।
দীর্ঘ বছর লোকসানে থাকা কোম্পানিটির সর্বশেষ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকেও (জানুয়ারি-মার্চ) শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ১২ টাকা ৪৭ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে এই লোকসান ছিলো ১৪ টাকা ৯৬ পয়সা। ব্যাংক ঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমে আসায় লোকসানও কিছুটা কমেছে।
ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সে মুনাফা বাড়লেও দরবৃদ্ধি অস্বাভাবিক
আরেক কোম্পানি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর গত ১৭ মে শেয়ারটির দর ছিল ৮২ টাকা ৭০ পয়সা, যা বেড়ে ৯ জুন ১১৬ টাকা ১০ পয়সায় ওঠে। পরে কিছুটা কমে গতকালের লেনদেন শেষে দাঁড়ায় ১০৮ টাকা ৩০ পয়সায়।
২০১৬ সালে তালিকাভুক্ত এ ক্যাটাগরির কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) বেড়ে ১ টাকা ৬১ পয়সা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১ টাকা ৬ পয়সা। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ (এনওসিএফপিএস) ২ টাকা ৫৯ পয়সায় উন্নীত হয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ৭৮ পয়সা। এছাড়া ৩১ মার্চ ২০২৬ শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) দাঁড়িয়েছে ৩২ টাকা ৮৭ পয়সা।
তবে আর্থিক সূচকে উন্নতি থাকলেও বর্তমান দরবৃদ্ধি স্বাভাবিক নয় বলে মনে করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তাই অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি ও লেনদেনের কারণ অনুসন্ধানে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেনের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সম্প্রতি তিন কোম্পানির শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও লেনদেনের বিষয়টি কমিশনের নজরে এসেছে। বিষয়গুলো আমরা তদন্তের জন্য পাঠিয়েছি। স্টক এক্সচেঞ্জ এ বিষয়ে তদন্ত করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবে। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

















