দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সিসার চালানসহ মাদক কারবারি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। ডিএনসি বলছে, গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুই সহোদর ইরান থেকে সিসা বিক্রির কার্যক্রম শিখে এসে বাংলাদেশে অনলাইনে এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করত।
গ্রেপ্তাররা হলেন আহমেদ শরীফি (৩৪) ও মেহদাদ শরীফি (৩৪) ইরানি বংশোদ্ভূত নাগরিক। এছাড়া অপর ব্যক্তি হলেন মো. মাকসুদ আলম (৪০)।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সেগুনবাগিচায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন।
মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, রাজধানীর গুলশান ও ভাটারা এলাকায় সমন্বিত বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক পরিমাণ সিসা উদ্ধারসহ একটি আন্তঃজেলা অনলাইন মাদক সরবরাহকারী চক্রের মূলহোতা দুই সহোদরসহ মোট ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। গ্রেপ্তারকালে তাদের কাছ থেকে ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা , ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি সিসা সেবনের কয়লা, ৫টি মোবাইল ফোন ও বিপুল পরিমাণ সিসা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফি নামের এই দুই সহোদরের নেতৃত্বে একটি চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশে অনলাইনে অবৈধ সিসা ও সিসা সেবনের উপকরণ বিক্রি ও সরবরাহ করে আসছে। ওই পেইজের মাধ্যমে অর্ডার করা দুইটি সিসা র চালান দেশীয় কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পাঠানো হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ডিএনসির একটি বিশেষ রেইডিং টিম গত ২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা এলাকায় প্রথম অভিযান চালায়। সেখান থেকে ওই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো ১ কেজি সিসা সহ একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। তারপর একই দিন রমনা থানাধীন মালিবাগ থেকে একই পেজের নামে পাঠানো আরও ১ কেজি সিসা সহ দ্বিতীয় পার্সেলটি জব্দ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, জব্দ করা পার্সেল দু’টির প্রেরক-ঠিকানা যাচাই করে অভিযানিক দল একই দিনে গুলশান থানাধীন কালাচাঁদপুরে একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত ওই দুই সহোদরকে ভাড়া বাসা থেকে হাতেনাতে আটক করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ওই ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে আরও ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা এবং ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার দুই সহোদর জানায়, তাদের সরবরাহ করা সিসা র একটি বড় অংশ আসত মো. মাকসুদ আলম নামে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি ভাটারা থানাধীন নূরেরচালা এলাকায় বসবাস করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে ওইদিন রাতে অভিযানিক দলটি নূরেরচালাস্থ একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে মাকসুদ আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে আরও ১৮ কেজি সিসা ও ২১টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, গ্রেপ্তার দুই সহোদর বাংলাদেশি নাগরিক হলেও তাদের পূর্বপুরুষ ইরানি। তারা দুইজনও দীর্ঘ সময় ইরানে অবস্থান করেছেন। সেখানে থাকার সময় তারা সিসা ব্যবসার কার্যক্রম, বাজারব্যবস্থা এবং সরবরাহ পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে ফিরে তারা একই ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে অনলাইনে সিসা বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন। তারা একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন, যা বাংলাদেশে অনলাইনে সিসা বিক্রয়কারী প্রথম দিকের পেজগুলোর অন্যতম। তারা ফেসবুকের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের ছবি প্রকাশ, অর্ডার গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং ডেলিভারির সমন্বয় করতো। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর দেশীয় কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্সেল পাঠাতো।
ডিএনসি জানায়, চক্রটি মূলত বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য গ্রহণ করত। বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা অর্থ সংগ্রহ করত, যাতে প্রকৃত লেনদেনের উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং অর্থের প্রবাহ যাচাই করা হচ্ছে।
ডিএনসি আরও জানায়, অভিযানে জব্দ করা মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিস্তৃত গ্রাহক ডাটাবেস উদ্ধার করেছে ডিএনসি। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্রেতার তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্ডারের বিবরণ এবং লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে।
এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক, সহযোগী এবং এই নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান ডিএনসির অতিরিক্ত এই পরিচালক।

















