তরুণ সমাজ ধ্বংসের ‘টাইম বোমা’ ইয়াবা

1

দেশে মাদকের ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে চলছে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের মাদক ব্যবহার এবং বেচাকেনা চলছে প্রকাশ্যে। সর্বনাশা মাদকের এই আগ্রাসন থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তরুণ সমাজের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা সর্বাধিক। পাশাপাশি চলছে অনলাইন জুয়া। ইয়াবাও যত্রতত্র হাতের কাছে পাওয়া যায়। ‘ইয়াবা’ তরুণ সমাজকে ধ্বংস করার টাইম বোমা বলে উল্লেখ করেছেন মনোরোগ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ইয়াবাসহ কোনো মাদক যেন দেশে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই কর্মকর্তা বলেন, দেশের অভ্যন্তরে যারা এই কারবারে জড়িত হবে তাদের বিরুদ্ধে চীন, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই এই ভয়ংকর মাদকের ব্যবসা ও ব্যবহার নির্মূল করা সহজেই সম্ভব।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, দেশেই এখন ইয়াবা তৈরি হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতিপূর্বে কেরানীগঞ্জসহ একাধিক স্থানে এই মাদক তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছে। বর্তমানে রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত যত্রতত্র পাওয়া যাচ্ছে ইয়াবা। বেচাকেনা হচ্ছে প্রকাশ্যেই। তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি আসক্ত ইয়াবায়। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে মাদক ছোবল দেয়নি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, হাত বাড়ালেই এই মাদক মেলে।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মাদকের মূল হোতাদের দমনে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কর্তৃক আয়োজিত মাদক প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন সভায় তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন। মাদক বিস্তার রোধ করা বর্তমানের সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে রাজধানী থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর প্রতি জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত মাদকের গডফাদার, ব্যবসায়ী ও ডিলারের তালিক আপডেট করার কার্যক্রম শুরু করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, রাজধানী থেকে প্রতিটি জেলা ও উপজেলার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী, গডফাদার ও সরবরাহকারীদের তালিকা তাদের হাতে রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা মাদকের গডফাদার ও ব্যবসায়ে জড়িত এবং সেখানে থেকে সারা দেশে সরবরাহকারীদেরও তালিকা রয়েছে। সেই তালিকায় অনেক ব্যবসায়ীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই তালিকা অনুযায়ী রাজধানী থেকে দেশব্যাপী মাদকব্যবসায়ী ও গডফাদারদের গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মনোরোগ বিজ্ঞান ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ব্যবহার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। পাশাপাশি সামাজিক অপরাধও আসক্তদের মধ্যে চরম নিষ্ঠুরতা বেড়ে চলছে। মাদকের টাকার জন্য কিংবা এর থেকে সন্তানদের রক্ষা করতে ছেলের হাতে পিতা-মাতা ও আপনজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। প্রায়ই পত্রিকায় এই ধরনের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। মাদক সীমান্ত ছাড়াও নানা পথে প্রবেশ করছে। সীমান্ত থেকে সড়ক পথে কিংবা নৌ পথে রাজধানীসহ মাদকব্যবসায়ীরা পৌঁছে দেয়। এ ব্যবসা করে অল্প সময়ে কোটিপতি ও গাড়ি-বাড়ির মালিক হওয়া যায়। এ কারণে এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যও জড়িত। রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত প্রকাশ্যে বেচাকেনা এবং সহজলভ্য হওয়ার অন্যতম কারণ বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সর্বনাশা মাদকের ব্যাপক বিস্তার যেভাবে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে সন্তানরা নিরাপদ নয়।

রাজধানী মোহাম্মদপুর ‘জেনেভা ক্যাম্প’ মাদকের অন্যতম স্পট। বছিলা, কামরাঙ্গীর চর, রায়ের বাজার মাদকের বেচাকেনা প্রকাশ্যে কিশোরদের বেচাকেনা করতে দেখা যায়। ঐসব এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা বড় ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে এ মাদক ব্যবসা চলে আসছে।

তেজগাঁও বিভাগের উপ পুলিশ-কমিশনার মো. ইবনে মিজান বলেন, জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় ২৪ ঘণ্টা পুলিশের তত্পরতা থাকে। এছাড়া, মোহাম্মদপুর এলাকায় যেসব স্থানে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ছিল প্রতিদিনই অভিযান অব্যাহতভাবে চলছে। গড়ে অর্ধশতাধিক মাদক বিক্রেতা, ব্যবসায়ী ও ক্রয়কারী, ছিনতাইকারীসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে। বর্তমানে ঐসব এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক। এলাকাবাসী পুলিশের এই অভিযানে শান্ত বলে তিনি জানান।

এছাড়া, রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, সবুজবাগ, মুগদা, খিলগাঁও, বাসাবো, যাত্রাবাড়ী, ডেমরাসহ পুরাতন ঢাকার অলিগলি প্রকাশ্যে দিনরাত চলে মাদকের ব্যবসা। এসব কারণে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে কয়েক ব্যবসায়ী জানান। তারা বলেন, একশ্রেণির নেতাকর্মী নিয়মিত চাঁদা নিয়ে এই ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে।

মহানগর গোয়েন্দা প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও পেশাদার অপরাধীদের তালিকা তাদের কাছে রয়েছে। জড়িতরা প্রতিদিনই গ্রেপ্তার হচ্ছে বলে তিনি জানান।

র‌্যাবের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, রাজধানীসহ দেশব্যাপী মাদক বিক্রিসহ যে কোনো ধরনের অপরাধ করে কারো পার পাওয়ার সুযোগ নেই। কিশোর গ্যাংসহ অন্যান্য অপরাধীদের তালিকা তাদের কাছে রয়েছে। প্রতিটি এলাকায় র‌্যাব নিয়মিত মনিটরিং করে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।

দেশের অন্যতম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, মাদকাসক্তদের মধ্যে ইয়াবা আসক্তদের সংখ্যা সর্বাধিক। এদের সংখ্যা শতকরা ৮০ ভাগের ওপরে। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থীরাও কম নয়। প্রতিদিন যত মাদকাসক্ত চিকিৎসার জন্য আসে এর মধ্যে সিংহভাগই শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, একটি পরিবারে এক জন মাদকাসক্ত সন্তান থাকলে পুরো পরিবারই ধ্বংসের মুখে পড়ে। আসক্ত তরুণরা তাদের পিতামাতাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নির্মম আচরণ করে। তবে দীর্ঘসময় চিকিৎসাসেবা দিলে সুস্থ হয়ে যায়; যদিও তাদের বেশির ভাগই জীবনভর সুস্থ থাকতে পারে না। হাতের নাগালে মাদক থাকায় আবারও আসক্ত হয়ে পড়ে কিংবা মাদকাসক্ত বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে দ্বিতীয় বার একই ভুল করে।

তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূল সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষ সচেতন হলে এই চক্রকে দমন করা সম্ভব। মাদকের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সবাকেই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যাতে এটি দেশে প্রবেশ কিংবা কোনো এলাকায় কেউই বিক্রি করতে না পারে। পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে।

মনোরাগ বিশেষজ্ঞ ডা. রায়হানুল ইসলাম বলেন, মাদকাসক্তদের মধ্যে মরণব্যাধিসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্তদের হার বাড়ছে। তরুণ সমাজকে রক্ষায় মাদক নির্মূল করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও জানান যে, তরুণ সমাজ ছাড়া সবপেশার মধ্যে কমবেশি মাদকাসক্ত রয়েছে। মাদক সমাজে একটি অভিশপ্ত এবং তরুণ সমাজকে ধ্বংস করারও উপকরণ। এর নির্মূল করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি জানান।

Advertisement