হার্ট বা হৃদযন্ত্রে ব্লক – এই সমস্যার সাথে তো সবাই পরিচিত। তবে প্রশ্ন হলো, হার্টে ব্লক হওয়ার পিছে কারণটা কি? উত্তরটা লুকিয়ে আছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, দীর্ঘসময় ধরে মানসিক চাপ ইত্যাদি হৃদযন্ত্রের রক্তনালীকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে। হার্টের রক্তনালী সরু হয়ে গেলে শরীর নিজ থেকেই কিছু সংকেত দেয়। বুকে চাপ অনুভব, শ্বাসকষ্ট, আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক ইত্যাদি সমস্যার চিকিৎসায় ডাক্তাররা একটি নাম প্রায়ই উল্লেখ করেন, তা হলো করোনারি অ্যানজিওপ্লাস্টি।
আমাদের হার্টকে সচল রাখতে করোনারি আর্টারি নামের কিছু সরু রক্তনালী হার্ট মাসেলে (পেশী) অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত সরবরাহ করে। সময়ের সাথে সাথে এসব আর্টারির ভেতরের দিকে চর্বি, কোলেস্টেরলসহ বিভিন্ন উপাদান জমাট বেঁধে একরকম পুরু স্তর তৈরি করে, যাকে বলা হয় প্লাক। এই প্লাক জমতে জমতে রক্তনালী সরু হয়ে যায়, ফলে হার্ট মাসেলে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় করোনারি আর্টারি ডিজিজ। ব্লক বেশি হয়ে গেলে বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভব হতে পারে এবং ব্লক সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে ঘটতে পারে হার্ট অ্যাটাক। মূলত ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল ইত্যাদি কারণে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে।
করোনারি অ্যানজিওপ্লাস্টি মূলত একটি মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতি, যেখানে বড় কোন সার্জারির প্রয়োজন হয় না। প্রথমে হাতের কব্জি বা কুঁচকির কাছে ছোট ছিদ্র করে সরু নলের মতো ক্যাথেটার রক্তনালীর ভেতর দিয়ে হার্ট পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়। এক্স-রে ইমেজিংয়ের সাহায্যে ব্লকের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। এরপর, ক্যাথেটারের ডগায় থাকা একটি ছোট বেলুন (ডিভাইজ) ফুলিয়ে সরু হয়ে যাওয়া রক্তনালীকে প্রশস্ত করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেখানে একটি স্টেন্ট বা ছোট নল স্থাপন করা হয়, যা রক্তনালী খোলা রাখতে সাহায্য করে। সাধারণত এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই সম্পুর্ণ প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে যায়।
যাদের করোনারি আর্টারিতে ব্লক থাকে ও ওষুধ খেয়ে যাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় না কিংবা যারা লাইফস্টাইল পরিবর্তনে ব্যর্থ হন তাদের জন্য অ্যানজিওপ্লাস্টি একটি কার্যকরী সমাধান হতে পারে। বিশেষ করে তীব্র হার্ট অ্যাটাকের সময় দ্রুত রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে এই পদ্ধতি জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া যাদের ঘনঘন বুকে ব্যথা হয় তাদের চিকিৎসায়ও ডাক্তাররা অ্যানজিওপ্লাস্টি’র পরামর্শ দিতে পারেন, তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা, ব্লকের সংখ্যা, অবস্থান ও তীব্রতা অনুযায়ী।
চট্টগ্রামের রোগীদের করোনারি অ্যানজিওপ্লাস্টিসহ আধুনিক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম। এখানে কার্ডিওলজি বিভাগে অভিজ্ঞ কনসালটেন্ট ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্টরা হার্টের সব ধরনের চিকিৎসা করে থাকেন। অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাবে করোনারি অ্যানজিওগ্রাম ও অ্যানজিওপ্লাস্টিসহ বিভিন্ন ইন্টারভেনশনাল কার্ডিয়াক চিকিৎসা করা হয়। আছে করোনারি কেয়ার ইউনিট, কার্ডিওথোরাসিক আইসিইউ এবং ২৪/৭ জরুরি বিভাগ, যেখানে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও সমন্বিত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়।
অ্যানজিওপ্লাস্টির পর রোগীর সুস্থতা নির্ভর করে সঠিক লাইফস্টাইল মেনে চলার ওপর। খাদ্যাভ্যাসে চর্বি ও লবণ কমিয়ে আনা, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম, ধূমপান থেকে দূরে থাকা, নিয়মিত ফলোআপ চেকআপ ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদে হার্টকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। বেশিরভাগ রোগীই কয়েক দিনের মধ্যে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে, তবে কোন অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিৎ।
লেখক
ডা. জহির উদ্দিন মাহমুদ ইলিয়াছ
এমবিবিএস, এমসিপিএস (মেডিসিন) ডিইএম (ডায়াবেটলজি অ্যান্ড এন্ডোক্রাইনোলজি), এমডি (কার্ডিওলজি)
সিনিয়র কনসালট্যান্ট, কার্ডিওলজি
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম
















