সরকারের অনুমোদন ছাড়াই অবৈধভাবে চট্টগ্রামে রিফাইনারি নির্মাণ করছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল

25

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারের অনুমোদন ছাড়াই চট্টগ্রামে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের সিআরইউ (ক্যাটালিস্ট রিফরমিং ইউনিট) প্ল্যান্টটিকে রিফাইনারিতে রূপান্তর করছে। সম্প্রসারণ ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের জন্য সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির করা আবেদন প্রায় ৯ মাস আগে নাকচ করে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এরপরও রিফাইনারি তৈরি করছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল। আগামী কয়েকমাসের মধ্যে রিফাইনারিটি উৎপাদনে যাওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

Advertisement

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার জুলধা ইউনিয়নের ডাঙ্গারচর এলাকায় সুপার পেট্রোকেমিক্যালের সিআরইউ প্ল্যান্ট রয়েছে। বছরে সাড়ে ছয় লাখ টন ন্যাফতা ও কনডেনসেট প্রসেসিং সক্ষমতা আছে প্ল্যান্টটির।

অভিযোগ ওঠেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অনুমোদন না নিয়ে এটিকে পৌনে ২৬ লাখ টনের রিফাইনারিতে সম্প্রসারণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সুপার পেট্রোকেমিক্যালের সিআরইউ প্ল্যান্টটিকে রিফাইনারিতে সম্প্রসারণের বিষয়ে কোনো তথ্য নেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)।

বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালে বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপনের জ্বালানি নীতিমালা প্রনয়ণ করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপনের জ্বালানি নীতিমালা বাতিল করার বিষয়ে অর্ন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে আলোচনা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নীতিমালাটি বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বেসরকারি ওই নীতিমালার আলোকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে মজুত, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে আবেদন করে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড (এসপিএল)।

আবেদনে পুরোনো সিআরইউ প্ল্যান্টের সঙ্গে বছরে সোয়া ১৯ লাখ টন ক্রুড/কনডেনসেট পরিশোধনের রিফাইনারি প্রতিষ্ঠাসহ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল বিপণনের বিষয়ে অনুমতি চাওয়া হয়। এরপর জ্বালানি বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) জাহিদ হোসাইনকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে বিপিসি। ওই কমিটিকে প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শনসহ এসপিএল এর আবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

পরে কমিটিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির একজন ব্যবস্থাপককে কো-অপ্ট করা হয়। ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সাত সদস্যের কমিটি কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে জুলধা ইউনিয়নে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির সিআরইউ প্ল্যান্ট এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করেন। ৮ এপ্রিল বিপিসি চেয়ারম্যানকে প্রতিবেদন জমা দেন সাত সদস্যের সেই কমিটি।

প্রতিবেদনে ‘নীতিমালার আলোকে প্রাথমিক অনুমতি প্রদান ও প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ শেষ হলে রিফাইনারির চূড়ান্ত অনুমোদন, অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ এবং বিপণনে অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক বিবেচনা করা যেতে পারে’ বলে সুপারিশ করে বিপিসির কমিটি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সুপার পেট্রোকেমিক্যালে বর্তমানে ন্যাফতা ও কনডেনসেট প্রসেসিং ইউনিটে দৈনিক ১৬ হাজার ৯শ ব্যারেল হিসেবে বার্ষিক ছয় লাখ ৫০ হাজার টন উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তাবিত ক্রুড/কনডেনসেট অয়েল প্রসেসিং ইউনিটে দৈনিক ৪৫ হাজার ব্যারেল হিসেবে বছরে উৎপাদন সক্ষমতা হবে ১৯ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমান ও প্রস্তাবিত মিলিয়ে বার্ষিক উৎপাদন দাঁড়াবে পৌনে ২৬ লাখ মেট্রিক টন।

বিপিসির ওই প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আবেদিত প্রকল্পটিতে কত টাকা বিনিয়োগ হবে, বেসরকারি এ প্রকল্পের যন্ত্রপাতিসহ অন্য প্রযুক্তি কোন দেশ থেকে আনা হবে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা কীভাবে সংস্থান করা হবে- সে বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।

প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ থাকবে কি না, নাকি দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগ হবে- সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রতিবেদনে নেই। প্রকল্পে বিনিয়োগের সঠিক আর্থিক পরিমাণ জানাও সম্ভব হয়নি। উপরন্তু অতিগোপনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রিফাইনারির প্রস্তাবিত প্রকল্পের সুপারিশ করেছে বিপিসি।

এরপর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সুপার পেট্রোকেমিক্যালের সেই আবেদন নাকচ করে দেয়। ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (পত্রসূত্র- ২৮.০০.০০০০.০০০.০২৬.৯৯.০০৬৫.২০.৪৪৯) স্মারকমূলে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রস্তাব নাকচ করে। নাকচের বিষয়টি বিপিসিকেও চিঠি মারফত অবগত করা হয়। এরপর প্রায় ১০ মাস অতিবাহিত হলেও বিষয়টি গোপন রাখে বিপিসি।

২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রস্তাব নাকচের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়- ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি গত ২৫/০৯/২০২৪ তারিখে জাখসবি-তে পাঠানো পত্রের জবাবে মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ ২৮.০০.০০০০.০০০.০২৬.৯৯.০০৬৫.২০.৪৪৯ স্মারকমূলে উক্ত কোম্পানির প্রস্তাব নাকচ করা হয়।

সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেডকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণনের ক্ষেত্রে ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা-২০২৩’ এর আওতায় এ বিভাগ থেকে কোনো প্রকার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে সূত্রোক্ত আবেদনটি বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিষয়টি নির্দেশক্রমে অবহিত করা হলো।’

ওইদিনের সভায় উপস্থিত দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের নতুন রিফাইনারি নির্মাণ, অপরিশোধিত তেল আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের জন্য করা আবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নাকচ করে দেয়।

বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) জাহিদ হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেড এর রিফাইনারি করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন নেই ।

বিষয়টি জানতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

বিপিসির সাবেক ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রণালয় কিংবা বিপিসির অনুমোদন ছাড়া পেট্রোলিয়াম জ্বালানি রিফাইনারির সম্প্রসারণ কিংবা নতুন নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ। এ ধরনের রিফাইনারির কাজে জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির প্রাথমিক অনুমতি, চূড়ান্ত অনুমতিসহ কয়েকধাপে অনুমতি নিতে হয়।

Advertisement