৬০ বছর পরও আবাসনের অন্ধকারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষার প্রসারে যতটা তোড়জোড়, আবাসন সংকটে ততটাই উদাসীনতা

6

মুশফিকুর আবরার রাফি, বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: পাহাড় ও সবুজের সমারোহে ঘেরা দেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) দেখতে দেখতে পার করেছে গৌরবময় ৬০ বছর। শিক্ষা ও গবেষণার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো। বর্তমানে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভৌত বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র বা জামাল নজরুল ইসলাম এনেক্স ভবনের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। একই সাথে শিক্ষক লাউঞ্জ, বিএনসিসি ভবন, প্রেস ভবন ও পরিবহন দপ্তর ভবনসহ প্রায় ৩৫ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ এগিয়ে চলছে ক্যাম্পাসে।

Advertisement

কিন্তু যে শিক্ষার্থী ও তাদের জীবনমানকে ঘিরে এই বিদ্যাপীঠের প্রাণস্পন্দন, সেই শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে। ৬০ বছর পূর্ণ করা একটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আজো সিংহভাগ শিক্ষার্থীকে তীব্র আবাসন সংকটে ধুঁকতে হচ্ছে। অথচ এই ক্যাম্পাসটি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার পেছনে মূল দর্শনের একটি বড় অংশ ছিল এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে চবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য যে কয়েকটি আবাসিক হল ও ছাত্রাবাস রয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। ফলে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থীকেই ক্যাম্পাসের বাইরে, দূরবর্তী শহরের মেসে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের কটেজে চড়া ভাড়ায় থাকতে হয়। এদিকে প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন দপ্তর, গবেষণা কেন্দ্র ও শিক্ষক ভবন নির্মাণের বড় বড় প্রকল্প আলোর মুখ দেখলেও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট লাঘবে তেমন কোনো কার্যকর মেগা প্রকল্প এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

মাঝেমধ্যে কিছু নতুন হল নির্মাণের পরিকল্পনা বা আনুষ্ঠানিকতার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এর কোনো সুফল পাচ্ছে না। দীর্ঘ বছর ধরে চলে আসা এই সংকট চবি প্রশাসনের অগ্রাধিকারের তালিকায় সবসময়ই যেন পেছনে পড়ে থাকে।

বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো প্রশাসনের স্বল্পমেয়াদী ও অপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যান। প্রশাসন বরাবরই শিক্ষা ও দাপ্তরিক ভবনের দৃশ্যমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলেও নতুন আবাসিক হল নির্মাণের ক্ষেত্রে ধীরগতি দেখিয়েছে।

এছাড়া সরকারের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক হলের জন্য যে বিশাল অংকের বাজেট বা মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাব পাঠানো হয়, তা বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও তদারকির চরম অভাব রয়েছে।

গবেষণাগার, প্রশাসনিক ভবন বা জাঁকজমকপূর্ণ ফলক উন্মোচনে যতটা দ্রুত অর্থ বরাদ্দ ও কাজ শুরু হয়, আবাসিক হলের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করা হয়। এমনকি যেসব হল নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর সিট বণ্টন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা থাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা সময়মতো নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী, গবেষক ও বিজ্ঞানী। অথচ ৬০ বছরে পদার্পণ করেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের হলের একটি সিটের জন্য বছরের পর বছর গণরুম বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি, গবেষণাগার ও দাপ্তরিক ভবনের পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে মেগা প্রকল্পের আওতায় একাধিক বহুতল আবাসিক হল নির্মাণ করতে হবে। ৬০ বছর পূর্তির এই সন্ধিক্ষণে এসে প্রশাসন যদি শিক্ষার মানোন্নয়নের পাশাপাশি আবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে না পারে, তবে ‘পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়’-এর ঐতিহাসিক স্বপ্নটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

Advertisement