জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে শপথ নিয়েছেন এসপিডি দলের নেতা ওলাফ শলস। গতকাল বুধবার পার্লামেন্টে ভোটাভুটির পর তাকে শপথ পড়ানো হয়। জার্মান পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ বুন্দেসটাগে এমপিদের ৭০৭ ভোটের মধ্যে ৩৯৫টি ভোট পান শলস। তার বিপক্ষে ভোট পড়ে ৩০৩টি। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জেতার পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পরিবেশবাদী রাজনৈতিক দল গ্রিনস পার্টি এবং ব্যবসাবান্ধব ফ্রি ডেমোক্র্যাটস দলের সঙ্গে জোট করেন এসপিডির নেতা ওলাফ।
ভোটের পর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ওলাফের হাতে চ্যান্সেলরের নিয়োগপত্র তুলে দেন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্ক ভাল্টার স্টাইনমায়ার। ওলাফকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোন ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন দেয়ার লায়েন অভিনন্দন জানিয়েছেন। ভোটের পর শলৎস জার্মান প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে যান। সেখানে প্রেসিডেন্ট ফ্রাংক-ভাল্টার স্টাইনমায়ার তার হাতে নবম ফেডারেল চ্যান্সেলর হিসাবে নিয়োগের আনুষ্ঠানিক পত্র তুলে দেন। এরপর শলৎস আবার বুন্ডেসটাগে ফিরে যান এবং সেখানে শপথ গ্রহণ করেন।
বিবিসি জানায়, জার্মানির নবসূচনা করতে যথাসাধ্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নতুন চ্যান্সেলর শলৎস। তিনি এরপর তার মন্ত্রিসভা ঘোষণা করবেন এবং নতুন মন্ত্রীরাও প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে গিয়ে নিয়োগপত্র গ্রহণ করবেন । নতুন মন্ত্রিসভায় ১৬ জন মন্ত্রী থাকছেন। এর মধ্যে সাতজন থাকছেন শলৎসের এসপিডি থেকে, পাঁচজন পরিবেশবাদী গ্রিন পার্টি এবং চার জন উদারপন্থি এফডিপি থেকে।
মেরকেলের মন্ত্রীরা শলৎসের মন্ত্রীদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। আর মেরকেলের অধীনে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা শলৎস তার দায়িত্ব তুলে দেবেন নতুন অর্থমন্ত্রী ক্রিস্টিয়ান লিন্ডনারের হাতে। গত সেপ্টেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে শলৎসের মধ্য বামপন্থি এসপিডি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসে এবং দুই মাসের দীর্ঘ আলোচনার পর পরিবেশবাদী গ্রিন এবং নব্য উদারপন্থি এফডিপি-র সঙ্গে জোট গঠনের চুক্তি করে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধের লড়াইয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা আছে জার্মানির নতুন সরকারের। তবে প্রাথমিকভাবে শলৎসের সরকার করোনাভাইরাস মোকাবেলাকেই অগ্রাধিকার দেবে।
বিশ্বমঞ্চ ও জার্মানিতে অ্যাঙ্গেলা মেরকেল যুগের অবসান হয়েছে। গতকাল বুধবার জার্মান চ্যান্সেলর হিসেবে ওলাফ শলসের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে মেরকেলের ১৬ বছরের শাসনামল। স্বভাবে শান্ত, সিদ্ধান্তে অবিচল, পরিকল্পনায় দূরদর্শী মেরকেল দীর্ঘদিন গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শরণার্থী, জলবায়ু সংকটসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সিদ্ধান্তে ইতিবাচক অবদান রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের নানা উস্কানি সত্ত্বেও দৃঢ় নেতৃত্বে ইউরোপকে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি। গণতন্ত্র-মানবাধিকার রক্ষা এবং ঐক্যবদ্ধ ইউরোপের ব্যাপারে সদা সোচ্চার ছিলেন তিনি। আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক মঞ্চে তার সমাপ্তি হলেও মানবাধিকার রক্ষায় সদা সোচ্চার মেরকেলকে মনে রাখবে বিশ্ব।
বিশ্বনেতা অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে জার্মানির রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও সাংবাদিক রোজালিয়া রোমানিক বলেছেন, অনেকের কাছে এখনও মেরকেলকে ছাড়া জার্মানি ও ইউরোপকে কল্পনা কঠিন। যিনি ইউরোপ ও জার্মানিকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। মেরকেল বিরোধীদের যখন মোকাবিলা করতেন, তখন তিনি বিনয়ী, অবিচল ও বাস্তববাদী হতেন। এমনকি ট্রাম্প ও পুতিনের বারবার উস্কানি সত্ত্বেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় তিনি শান্ত থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মেরকেল সব সময় নিজের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি অবিচল থাকতেন।
তিনি আরও বলেন, পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বে জার্মান চ্যান্সেলর মেরকেল নিজের পথ তৈরি করেছিলেন। তিনি তার পেশিশক্তি প্রদর্শন করতেন না, নির্ভর করতেন মেরুদণ্ডের দৃঢ়তায়। তার রাজনৈতিক দর্শন ছিল সত্যবাদিতা। তিনি বলতেন, মেরকেল সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলেন না।
আনুষ্ঠানিক ওই বিদায়ের পর থেকে গতকাল পর্যন্ত কার্যনির্বাহী চ্যান্সেলর হিসেবে কাজ চালিয়ে যান মেরকেল। বিশেষ করে করোনা সংকটের কারণে জার্মানিতে বিদায়ী সরকারের পক্ষেও নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। এই সময়ে করোনা সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যৎ সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে ওই সংকট মোকাবিলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেরকেল।
এর আগে ২০১৭ সালে জার্মানির জাতীয় নির্বাচনে এবং পরবর্তী সময়ে রাজ্য পার্লামেন্টগুলোর নির্বাচনে অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি (সিডিপি) আগের চেয়ে অনেক কম ভোট পায়। এর পরই গত অক্টোবরে ইইউর সবচেয়ে শক্তিশালী এই নেতা দলের প্রধান হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দেন।

















