মিরসরাইয়ের জেলে পল্লীতে ইলিশের জন্য হাহাকার

194

ভরা মৌসুমে বড় আশা নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে খালি হাতে ফিরছেন চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জেলেরা। মজুরিতো দূরের কথা ইঞ্জিনচালিত নৌকার জ্বালানি খরচও উঠছে না। ২৩ জুলাই থেকে প্রতিদিন ভোরে মাছের আশায় গভীর সাগরে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু বিকেলে ফিরছেন শূন্য হাতে।

Advertisement

ভরা মৌসুমেও ইলিশ না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জেলে পরিবারগুলোকে। তার ওপর রয়েছে ঋণের বোঝা।

জানা গেছে, উপজেলার ২৯ জেলেপাড়ায় প্রায় ৫ হাজার জেলে পরিবার রয়েছে। মাছ ধরেই জীবন চলে তাদের। সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে দেশের অন্যান্য জায়গায় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। অথচ এখানকার চিত্র উল্টো। দুই বছর আগেও বঙ্গপোসাগরের মিরসরাইয়ের সাহেরখালী, ডোমখালী পয়েন্টের ইলিশ দিয়ে পুরো উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে বাইরে পাঠানো হতো। এখন মাছ না পেয়ে জেলেরা এই পেশা ছাড়ার চিন্তা করছেন।

সাগর ঘেঁষে শিল্পনগর গড়ে ওঠা, সাগর থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন, চর জেগে ওঠা ও ইলিশ প্রজননের পয়েন্ট দিয়ে জাহাজ চলাচল এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন এখানকার জেলেরা।

উপজেলার উপকূলীয় সাহেরখালী স্লুইসগেইট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা শতাধিক মানুষ অপেক্ষায় রয়েছেন ইলিশের। সাগর থেকে বোটে করে মাছ নিয়ে জেলেরা তীরে ভিড়বেন। দুপুর ২টার পর একে এক মাছ ধরার সব ইঞ্জিনচালিত নৌকা এসে গেছে। সবাই মাছের জন্য হুমড়ি খাচ্ছেন। কিন্তু মাছ নেই! একেকটি নৌকা থেকে কয়েক মণ করে মাছ নামার কথা, কিন্তু নামছে ৩-৫ কেজি করে মাছ। জেলেদের চোখে মুখে অন্ধকার। খালি হাতে ফিরে গেলেন সব ক্রেতা।

সাগর থেকে ফেরা শুকদেব জলদাশ ও সুধন জলদাশ জাগো নিউজকে বলেন, জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস জেলেদের জন্য বহুল কাঙ্ক্ষিত। মূলত বর্ষার এই তিন মাসের দিকে তাকিয়ে জেলেরা সারা বছর প্রহর গোনে। কারণ এ সময়ই সমুদ্রে প্রচুর ইলিশের দেখা মেলে। আর এই ইলিশ বিক্রির অর্থ দিয়েই জেলেদের সারা বছরের সংসার চলে। উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় ২৯টি জেলেপাড়া রয়েছে। এসব পাড়ায় প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে শুধু শাহেরখালীতেই আছে ৪২০টি জেলে পরিবার।

তারা আরো বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়েও এনজিও কিস্তি মাফ করেনি। আশা ছিলো নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগর থেকে ইলিশ ধরে চার-পাঁচ মাসে ঋণ পরিশোধ করবো। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় কিভাবে কী করবো বুঝতেছি না।

জগন্নাথ জলদাশ, জয় গোপাল জলদাশ জাগো নিউজকে বলেন, এখানে ইলিশ ধরার ১৫০টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। আজও ৪০-৫০টি নৌকা মাছ ধরতে সাগরে গেছে। আগে সাগরের কাছে গেলেও মাছ পাওয়া যেত, এখন গভীর সাগরে গিয়েও মাছ পাচ্ছি না। সব নৌকা মিলিয়ে ৫ মণ মাছও পাওয়া যায়নি। সাগরে চায়নারা আমাদের জাল কেটে দেয়। অনেক সময় জাহাজের কারণে জাল কেটে যায়। ছোট একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকা সাগরে গেলে ন্যূনতম ৭শ টাকার জ্বালানি লাগে। কিন্তু সারাদিন সাগরে থেকে ৪শ টাকার মাছও পাওয়া যায়নি। বকেয়া থাকতে থাকতে দোকানদারও আর জ্বালানি দেবে না।

উপকূলীয় জেলে সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হরিলাল জলদাশ বলেন, মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরের বিভিন্ন পয়েন্টের স্লুইচ গেইটের দরজাগুলো খুলে দেওয়ায় স্রোত বেড়ে গেছে সাগরের। তাছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মিতব্য বিভিন্ন কলকারখানার বর্জ্য সাগরের পানি দূষিত করে ইলিশের প্রজনন ধ্বংস করে দিচ্ছে। সাগর থেকে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনও অন্যতম কারণ হতে পারে।

মিরসরাই উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা নাসিম আল মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, এ সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জেলেরা প্রচুর পরিমাণ ইলিশ মাছ ধরছে। অনেকটা নিষেধাজ্ঞার সুফল বলা যায়। কিন্তু মিরসরাইয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখানকার জেলেরা সাগরে গিয়ে ইলিশ পাচ্ছে না।

তিনি বলেন, এর অন্যতম কারণ মাছের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তন। এখানকার বর্তমান পরিবেশ মাছের বিচরণক্ষেত্রের উপর প্রভাব ফেলেছে। মাছ একবার তার বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তন করলে সেখানে আর ফিরে আসে না। শিল্পনগর প্রতিষ্ঠা এর অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করছি।

Advertisement