চবি ছাত্রলীগের ‘বড় নেতা’ হতে ৪৭ গাড়ি ভাঙচুর

203

তাদের তেমন কোনো পদপদবি নেই। কিন্তু বড় পদপদবির জন্য প্রত্যাশা ছিল চরমে। তার জন্য সিনিয়র নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার ছিল। সুযোগ পেয়ে সেই কাজটিই করেছেন ১২ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। শাটল ট্রেনের অব্যবস্থাপনায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে তারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চালিয়েছেন তাণ্ডব। এক রাতেই ভাঙচুর করেছেন তারা ২৩টি বড় বাস ও ২৪টি ছোট গাড়ি। ভাঙচুর চালিয়ে লন্ডভন্ড করে দিয়েছেন উপাচার্যের বাংলো। ভাঙচুর করেছেন শিক্ষক ক্লাব এবং পুলিশ বক্সও। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে রেখে এমন তাণ্ডব চালালেও তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল চাঁদা আদায়। উপাচার্য ও পরিবহন দপ্তর থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়ে তা না পাওয়ায় মনের ক্ষোভ ঝেড়েছেন তারা। সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে তাদের এ উদ্দেশ্য ফাঁস হয়ে গেছে। এ ঘটনায় ১২ ছাত্রলীগ নেতাকে আসামি করে হয়েছে মামলাও।

Advertisement

অনুসন্ধানে দেখা যায়, যারা এ তাণ্ডব চালিয়েছে, তারা সবাই ছাত্রলীগের পাতি নেতা। বড় নেতা হওয়ার স্বপ্ন থেকেই চবিতে এমন অরাজকতা চালিয়েছে তারা। নেপথ্যে থেকে তাদের এ কাজে ইন্ধন দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়েরই দুই ‘বড় নেতা’। এদের একজন চবি ছাত্রলীগের সহসভাপতি মীর্জা খবির সাদাফ। আরেকজন সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু। যে ১২ ছাত্রলীগ নেতা ভাঙচুর চালিয়েছে, তাদের মধ্যে ১০ জন এই দুই নেতার অনুসারী।

চবির শাটল ট্রেনে দুর্ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ হয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দুটি মামলা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দুই মামলায় ১৪ শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও অজ্ঞাতনামা ১ হাজার আসামি করা হয়েছে। নাম উল্লেখ করা ওই ১৪ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। ওই ১৪ জনের ১২ জন চবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারা বড় কোনো পদে নেই ছাত্রলীগে। তারা উঠতি নেতা হিসেবে পরিচিত। ১২ জনের মধ্যে শুধু শফিকুল ইসলামের পদ রয়েছে। তিনি চবি ছাত্রলীগের উপপ্রচার সম্পাদক। অন্যরা সবাই এখনও কর্মী। ‘বড় নেতা’ হওয়ার স্বপ্ন থেকেই ভাঙচুরে অংশ নিয়েছেন ওরা। তবে ভাঙচুরে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন তারা সবাই।

উপচার্যের বাংলো ভাঙচুরের মামলায় আসামি হয়েছেন– ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শাকিল হোসেন আইমুন, সংস্কৃত বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের দীপন বণিক দীপ্ত, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মো. রিয়াদ হাসান রাব্বি, ইংরেজি বিভাগের ২০-২১ শিক্ষাবর্ষের নূর মোহাম্মদ মান্না, ইতিহাস বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের সৌরভ ভূঁইয়া, পালি বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আমিনুল ইসলাম এবং পদার্থবিদ্যা বিভাগের ১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শফিকুল ইসলাম ও অজ্ঞাতনামা ৫০০-৬০০ জন।

পরিবহন দপ্তরের গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় আসামি হয়েছেন– দর্শন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের সাজ্জাদ হোসেন, পরিসংখ্যান বিভাগের ১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মো. ইমরান নাজির ইমন, ফার্সি ভাষা বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের আনিসুর রহমান, ইতিহাস বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের নাসির উদ্দিন মো. সিফাত উল্লাহ, সংস্কৃতি বিভাগের ১৭-১৮ অনিক দাশ, বাংলা বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের অনিরুদ্ধ বিশ্বাস এবং মো. আজিমুজ্জামান ও অজ্ঞাতনামা ৪০০-৫০০ জন।

মামলার বিষয়ে হাটহাজারী থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আসামিদের যে তালিকা প্রকাশ হয়েছে, সেটি সঠিক হবে। আমরা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ধারাবাহিকভাবে আইনগত প্রক্রিয়ায় তদন্ত করব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. নূরুল আজিম সিকদার মামলার বিষয়ে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করা দুটি মামলা এজাহারভুক্ত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ও ঘটনাস্থল বিশ্লেষণ করে যাদের পেয়েছে, তাদের নাম প্রকাশ করেছে। এখনও অনেককে শনাক্ত করা যায়নি। তাই অজ্ঞাতনামা রাখা হয়েছে।’

নেপথ্যে ছিলেন দুই বড় ভাই

যে ১৪ জন আসামি হয়েছেন, তাদের মধ্যে ১২ জনই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। ১২ জনের মাঝে চবি ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক গ্রুপ সিক্সটি নাইনের অনুসারী ছয়জন হলেন– সৌরভ ভূঁইয়া, অনিরুদ্ধ বিশ্বাস, আনিসুর রহমান, মো. রিয়াদ হাসান রাব্বি, মো. নাসির উদ্দিন মো. সিফাত উল্লাহ ও শফিকুল ইসলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপুর অনুসারী গ্রুপ সিক্সটি নাইন। বগিভিত্তিক এই গ্রুপটি নগর আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী। চবি বগিভিত্তিক দখলের ভিত্তিতে সিক্সটি নাইনের দখলে আছে শাহজালাল হল। এই ছয়জনের পাঁচজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলে থাকেন। তবে মো. রিয়াদ হাসান রাব্বি হলে থাকেন না বলে দাবি করেন।

অন্যদিকে সিএফসি গ্রুপের অনুসারী চারজন হলেন শাকিল হোসেন আইমুন, দীপন বণিক দীপ্ত, মো. আজিমুজ্জামান ও নুর মোহাম্মদ মান্না। এই চারজন চবি শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মীর্জা খবির সাদাফের অনুসারী। সিএফসি গ্রুপের দখলে থাকা শাহ আমানত হলে থাকেন তারা। বগিভিত্তিক এই গ্রুপটি শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী। বর্তমানে সিএফসি গ্রুপটি দুই ধারাতে ভাগ হয়ে পড়েছে। একটি মীর্জা খবির নেতৃত্ব দিলেও অন্য ধারাটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন চবি ছাত্রলীগ সভাপতি রেজাউল হক রুবেল। ঘটনায় জড়িত থাকা ইমরান নাজির ইমন রুবেলের অনুসারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের আব্দুর রব হলে তাঁর অবস্থান। জড়িত থাকা আরেক শিক্ষার্থী অনিক দাশ বিজয় গ্রুপ ও চবি শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াছের অনুসারী। বিজয় গ্রুপের দখলে থাকা আলাওল হলে থাকেন তিনি। এ ঘটনায় সাজ্জাদ হোসেন নামে আরেক শিক্ষার্থীর নাম এলেও তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমিনুল ইসলাম নিজেকে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে দাবি করেছেন। ভাঙচুরে তাঁর নাম এলেও ঘটনার দিন রাতে ক্যাম্পাসে ছিলেন না বলে দাবি করেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে চাঁদাবাজদের এজেন্ডা

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শিরীণ আখতারের কাছে বিভিন্ন সময় চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। সর্বশেষ তারা ৪ সেপ্টেম্বর সকালে উপাচার্যের বাসভবনে এসে তাঁকে খোঁজাখুঁজি করেন। উপাচার্যকে না পেয়ে তাঁর বাসার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী হাসানকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়নকাজ থেকে তাদের ১০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে। দাবিকৃত চাঁদা না দিলে যে কোনো সময় উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেবেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়গামী শাটল ট্রেনের ছাদের সঙ্গে গাছের ডালের ধাক্কা লাগলে ১৭ জনের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাকে পুঁজি করে ওই ভাঙচুর করেন। নাম উল্লেখ করা সাত আসামিসহ অজ্ঞাতপরিচয় ৫০০ থেকে ৬০০ জন উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থী রামদা, লাঠিসোটা, ইটপাটকেল, লোহার রড, হকিস্টিক নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনে হামলা চালান ও নিরাপত্তা প্রহরীদের মারধর করেন। বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় দুটি মামলায় প্রথমটি বাদী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা শেখ মো. আবদুর রাজ্জাক। পরিবহন দপ্তর ভাঙচুরের দ্বিতীয় মামলাটির বাদী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কে এম নূর আহমদ।

এই মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ওই সাত আসামি গত ৫ সেপ্টেম্বর সকালে পরিবহন দপ্তরের প্রশাসক আশরাফ উদ্দিনের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদার দাবি করেন। দাবিকৃত চাঁদা না দিলে ভাঙচুর চালানোর হুমকি দেন। পরে শাটল ট্রেনের দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের নেতৃত্বে দা, লাঠিসোটা, ইটপাটকেল, লোহার রড ও হকিস্টিক নিয়ে ৪০০-৫০০ জন উচ্ছৃঙ্খল ছাত্রছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দপ্তরে তালা দিয়ে ২৩টি বাস ও ২৪টি ছোট গাড়ি ভাঙচুর করেন।

যা বলছেন দুই ‘বড় ভাই’

দুই মামলায় ১৪ আসামির সবচেয়ে বেশি অনুসারী সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপুর। মামলা ও আসামিদের শাস্তির ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, ভাঙচুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে থাকার কারণে নির্দিষ্ট কারও বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হলে, তা হয়রানি হবে।

অন্যদিকে সিএফসি গ্রুপের নেতা ও চবি শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মীর্জা খবির সাদাফ বলেন, চাঁদার বিষয়টি সম্পূর্ণ আজগুবি। ৪০০-৫০০ শিক্ষার্থী এক সঙ্গে কীভাবে চাঁদা দাবি করতে পারে। আর মামলা করা হলে এক হাজার জনের মাঝে শুধু এই ১৪ জনের নাম কেন রাখা হলো। এখানে অন্য উদ্দেশ্য আছে।

যা বলছেন অভিযুক্তরা

প্রথম মামলার আসামি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সেদিন আন্দোলনে যারা ভাঙচুর করছিল, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কয়েকজন প্রতিবাদ করেছি। তবুও মামলায় আমাদের নাম এসেছে। যদি সিসিটিভি ফুটেজে কোথাও আমার ভাঙচুরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে আমি আত্মসমর্পণ করব। অন্যদিকে মিথ্যা মামলা হলে এর দায়ভার কে নেবে, সেটা আমি জানতে চাই।’

নাসির উদ্দিন মো. সিফাত উল্লাহ বলেন, ‘আন্দোলনের সময় আমি জিরো পয়েন্টে ছিলাম। পরিবহন দপ্তরের দিকে আমার যাওয়া হয়নি। এ ছাড়া আমার সঙ্গে বেশ কিছু সময় দু’জন সহকারী প্রক্টরও ছিলেন।’

Advertisement