পরিচালকের ছত্রছায়ায় পাসপোর্ট অফিসে দালাল চক্রের কর্মসংস্থান

838

চট্টগ্রাম নগরীর মনসুরাবাদস্থ বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে পরিচালকের যোগসাজশে দালালদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মিলছে না কাঙ্খিত সেবা, পদে পদে হয়রানি হচ্ছে গ্রাহকেরা। এ কার্যালয়ে বিভাগীয় পরিচালক হিসেবে মোঃ সাইদুল ইসলাম যোগদানের পর থেকে তার ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে চিহ্নিত দালাল চক্রের নতুন কর্মসংস্থান। বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে গ্রাহক বা সেবা প্রার্থীদের প্রবেশ করতে হলে মূল গেইটে জনৈক বহিরাগত লোকের কাছে থাকা রেজিষ্টারে নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও কি কারণে এসেছে তা বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করতে হয়। কিন্তু দালালদের প্রবেশে কোন ধরণের বাধা নেই কিংবা রেজিস্টারে তাদের নাম-ঠিকানাও লিখতে হয়না। পরিচালকের নির্দেশনায় তার বাসভবনের সিড়িঁ সংলগ্ন নীচ তলার ১০৭ নম্বর কক্ষে বহিরাগত দালাল দিয়ে পাসপোর্টের আবেদনপত্রগুলোর ‘বিশেষ চিহ্ন’ বাছাই করার কাজে কয়েকজনকে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ে অফিসের কতিপয় কর্মচারী তাদেরকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যোগদানের কিছুদিন পর অসৎ উদ্দেশ্যে দালালদের সাথে গোপন বৈঠকও করেন পরিচালক সাইদুল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। কর্তৃপক্ষকে মাসোহারা দিয়ে ম্যানেজ করার জন্য তারা কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে একটি ফান্ড তৈরী করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাসপোর্ট পাইয়ে দেয়ার জন্য কর্মকর্তার নামে চাঁদা চেয়ে না পাওয়ায় পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারী সাদী ক্ষিপ্ত হয়ে হাবিবুল হাসান রণি ও শাকিল নামে দুই সেবাপ্রার্থীকে মারধর করে আটক রাখার অভিযোগ রয়েছে। শুধু রণি ও শাকিল নয়, সেবাপ্রার্থীরা তাদের কোন প্রয়োজনে পরিচালকের সাথে দেখা করতে চাইলে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং দূর্ব্যবহারের শিকার হন। সরেজমিনে এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

Advertisement

সূত্রমতে, বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মোঃ সাইদুল ইসলামের সাথে দালালদের অঘোষিত চুক্তি (টাকার বিনিময়ে) থাকার কারণে তাদের মাধ্যমে জমাকৃত ‘বিশেষ চিহ্নিত’ পাসপোর্ট আবেদনের ফাইলগুলো খুব দ্রুততার সাথে হালনাগাদ করা হয়। দালালদের ‘বিশেষ চিহ্ন’ ব্যতীত ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাড়িঁয়ে থেকে কিছু সাধারণ গ্রাহক তাদের পাসপোর্ট আবেদন জমা করলেও সেগুলো দৈনিক হালনাগাদ করা হয়না বলে অভিযোগ উঠেছে। দিন শেষে ‘বিশেষ চিহ্ন’ ব্যতীত আবেদনগুলো সাবমিট না দিয়ে আলাদা করে রেখে দেয়া হয়। জরুরী পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কিছু কিছু সাধারণ গ্রাহক রি-ইস্যু পাসপোর্ট আবেদন করার পর অনলাইনে চেক করে যখন বুঝতে পারেন যে আবেদন হালনাগাদ করা হয়নি তখন প্রাপ্তি স্বীকারপত্রের তারিখ অনুযায়ী পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গেলে তারা জানতে পারেন, পরিচালকের নির্দেশে কর্মচারীরা আবেদনগুলো সাথে সাথে আপলোড না দিয়ে ১০-১৫ দিন বিলম্বে আপলোড দেয়ায় যথাসময়ে পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

নমুনা হিসেবে পাসপোর্ট অবেদনের ফাইল নং- ৪০০৬-০০০৪৩১৬৫৪, ৪০০৬-০০০৪৩৫৮৫৬, ৪০০৬-০০০৪৩৫৫৬৭, ৪০০৬-০০০৪৩৩১৪৮, ৪০০৬-০০০৪২৮৬৯৩ ও ফাইল নং- ৪০০৬-০০০৪২৮২৫৭। শুধুমাত্র পরিচালক ও গুটি কয়েক কর্মচারী অফিসকে জিম্মি করে রাখার কারণে এ রকম আরও অসংখ্য আবেদনকারী প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে। জমাকৃত কিছু কিছু আবেদন পত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট সরিয়ে আবেদনগুলোকে অবজেকশনে রেখে কতিপয় কর্মচারী তাদের কর্মকর্তার নাম বলে আবেদনকারীদের নিকট থেকে অর্থ আদায় কওে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কিছুর মূল হোতা বিভাগীয় এই পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক মোঃ সাইদুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া নতুন পাসপোর্ট আবেদনকারীদের পুলিশ প্রতিবেদনের জন্য সিটিএসবি বা ডিএসবিতে প্রেরণেও গড়িমসি করার কারণে তারাও নির্দিষ্ট সময়ে পাসপোর্ট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভূক্তভোগী গ্রাহকেরা এ বিষয়ে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে যোগাযোগ করলে পাসপোর্ট পাইতে আরও ১৫/২০ দিন সময় লাগতে পারে বলে তারা জানান। অথচ দালাল চক্রের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে পাসপোর্ট আবেদন জমা করলে নির্দিষ্ট সময়ে পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে বলেও একজন ভূক্তভোগী জানান।

এদিকে গত ৩ ডিসেম্বর রোববার মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে রনি ও শাকিল নামে ২ সেবা প্রত্যাশীকে খুব দ্রুত সময়ে পাসপোর্ট পাইয়ে দেয়ার জন্য কর্মকর্তার নামে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবী করে কর্মচারী সাদী। এ বিষয় নিয়ে অফিসে বাক-বিতন্ডার এক পর্যায়ে রনি ও শাকিল আটকে রেখে মারধর করে কর্মচারী সাদী। খবর পেয়ে মারধরের শিকার সেবাপ্রার্থী রণির ভাই আইনী সহযোগিতা চেয়ে জরুরী সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করার পর সিএমপি’র ডবরমুরিং থানার এস.আই জানে আলম ঘটনাস্থলে পৌঁছে রনি ও শাকিলকে উদ্ধার করে।

হাবিবুল হাসান রনি বলেন, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে শাকিল ও আমাকে মারধর করে আটক রাখে। খবর পেয়ে আমার ভাই জরুরী সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে ডবলমুরিং থানা পুলিশ আমাদেরকে উদ্ধার করে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিচালকের নির্দেশনায় তার বাসভবনের সিড়িঁ সংলগ্ন নীচ তলার ১০৭ নম্বর ও ২য় তলার ২০৭ নম্বর কক্ষে বহিরাগত দালাল দিয়ে পাসপোর্টের আবেদনপত্রগুলোর ‘বিশেষ চিহ্ন’ বাছাইপূর্বক ফাইলগুলো আলাদা করে রাখার কাজে মোঃ রেজাউল করিম, মোহাম্মদ বেলাল, মোহাম্মদ সেলিম ও অনিকসহ আরও কয়েকজন ব্যস্ত থাকেন।

আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইয়ে পরিচালকের একান্ত আস্থাভাজন অফিস সহকারী মোঃ সাইফুদ্দিন, উচ্চমান সহকারী মোঃ জসিম উদ্দিন, সুপার শওকত আলী মোল্লা ও হিসাব রক্ষক মোঃ সুমন তাদেরকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ। এছাড়া কোন কোন কর্মচারী পরিচালকের আদেশ/নির্দেশ মানতে অনীহা প্রকাশ করলে মহাপরিচালকের (ডিজি) ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাদেরকে বদলী করানোর হুমকি দেয়া হয় বলে প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ।

সূত্রমতে, মনসুরাবাদস্থ বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের সামনে একটি ব্যাংক বুথ ছাড়া আশপাশে আগে থেকেই আর কোন ধরণের দোকানপাট ছিলনা। বর্তমান সময়ে অফিসের আশপাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি ভাসমান দোকান। অপেক্ষমান আবেদনকারীরা যে কোন প্রয়োজনে নির্দিষ্ট দালালের কাছে যাওয়ার জন্য ঐসব দোকানীরা উদ্বুদ্ধ করে।

এ ব্যাপারে বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের পরিচালক মোঃ সাইদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বিষয়গুলো অস্বীকার করেন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালচক্রের আধিপত্য বিস্তারের বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তকালে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে জানান ভূক্তভোগী সেবা প্রার্থীরা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে অনিয়ম ও গ্রাহক হয়রানি রোধসহ দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে ভূক্তভোগীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় ও দপ্তরের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

Advertisement