পেট ভেদ করে বেরিয়ে গিয়েছিল গুলি, মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এবার ‘জুলাই জাতীয় বিশেষ সম্মাননা’ পেলেন সাগর

3

নিজস্ব প্রতিবেদক: দুই বছর আগেও তাঁর জীবন নিয়ে ছিল গভীর অনিশ্চয়তা। আন্দোলনের রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে পেটের এক পাশ দিয়ে প্রবেশ করা গুলি অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নিস্তেজ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জীবন বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। পরিবারের সদস্য, সহযোদ্ধা ও স্বজনদের অনেকেই তখন ধরে নিয়েছিলেন—হয়তো আর ফিরবেন না তিনি।

Advertisement

কিন্তু মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা সেই তরুণ ছাত্রনেতা ওমর ফারুক সাগর এবার পেলেন ‘জুলাই জাতীয় বিশেষ সম্মাননা’।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান, শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ওমর ফারুক সাগরের হাতে ‘জুলাই জাতীয় বিশেষ সম্মাননা’ স্মারক তুলে দেন।

জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামে ছাত্র-জনতার কর্মসূচির অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ওমর ফারুক সাগর। আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন।

১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় আন্দোলন চলাকালে গুলিবর্ষণের ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর পেটের এক পাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি লুটিয়ে পড়েন। দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও জটিল আঘাতের কারণে তাঁর অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। কয়েক দিন ধরে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লড়াই করেন তিনি। চিকিৎসক, পরিবার ও সহযোদ্ধাদের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল উৎকণ্ঠার। অনেকেই তাঁর বেঁচে ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু অদম্য মানসিক শক্তি, চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং সবার দোয়ায় মৃত্যুকে জয় করে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন ওমর ফারুক সাগর। দীর্ঘ পুনর্বাসন শেষে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন তিনি।

দুই বছর পর সেই রক্তাক্ত সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণের মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন। উপস্থিত অতিথিদের অনেকেই করতালির মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দিত করেন।

সম্মাননা গ্রহণ শেষে ওমর ফারুক সাগর বলেন, “এই সম্মাননা শুধু আমার নয়। এটি জুলাই আন্দোলনের প্রতিটি শহীদ, আহত এবং সংগ্রামী ছাত্র-জনতার। যাঁরা জীবন দিয়েছেন, যাঁরা আজও শরীরে গুলির ক্ষত বহন করছেন, তাঁদের সবার প্রতি আমি এই সম্মান উৎসর্গ করছি।”

তিনি আরও বলেন, “একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা রাজপথে নেমেছিলাম, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমি আগামীতেও মানুষের পাশে থাকব।”

এক সময় যে তরুণকে বাঁচানোর জন্য হাসপাতালের আইসিইউর সামনে স্বজনরা অশ্রুসিক্ত চোখে প্রার্থনা করেছিলেন, সেই তরুণই আজ দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনে সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় বিশেষ সম্মাননা’ গ্রহণ করলেন। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা ওমর ফারুক সাগরের এই সম্মাননা তাই শুধু একটি পুরস্কার নয়, বরং সাহস, আত্মত্যাগ এবং বেঁচে ফেরার এক অনন্য ইতিহাসের স্বীকৃতি।

Advertisement