বিদেশি ফল ড্রাগন চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প অহরহ। ছোট্ট পরিসর থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে উদ্যোক্তা বনে গেছেন অনেকে। লাল টুকটুকে ছোট্ট মিষ্টি ফলটি এ দেশের মানুষ চড়া চামেও কিনেছেন শিশুসহ পরিবারের সবার প্রিয় বলে। জাগিয়েছে রপ্তানির সম্ভাবনা। কিন্তু চাষিরা ড্রাগনে আমদানি ও ব্যবহারনিষিদ্ধ গ্রোথ হরমোন ‘টনিক’ ব্যবহার করে নিজ পায়ে কুড়াল মেরেছেন। তাদের মুনাফার লোভে ড্রাগন আকারে ঢাউস হলেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন ক্রেতারা।
অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারত থেকে ‘ড. ডনস টনিক’ নামে ফল বড় করার ওষুধটি এ দেশে আসছে। বিক্রির সঙ্গে জড়িত চক্র সবাইকে ম্যানেজ করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। কলকাতার কৃষি উদ্যোক্তা মদন মোহন দা নিজেকে কৃষিবিজ্ঞানী দাবি করে ক্ষতিকর ওষুধটি এ দেশে ছড়িয়ে দিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে এসেছে। তাঁর শক্তিশালী চক্র কৃষকদের হাতে তুলে দিয়েছে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বিবেচনায় প্রায় পাঁচ দশক আগে জাপানের কৃষিতে নিষিদ্ধ টনিক বা ফাইটো হরমোন। ব্যবহারকারী অনেকের গাছ মরে গেছে; দামি টনিক না দিলে আসছে না ফল। চোখের সামনে সম্ভাবনাময় ফলটির চাষাবাদ ধ্বংস হলেও যেন কিছুই দেখেনি ভাব কৃষি বিভাগের। বাজার হারিয়ে উদ্যোক্তারা দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও নির্বিকার প্রশাসন।
টনিক বন্ধে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ব্যর্থ হলে ২০২২ সালের নভেম্বরে অভিমানে ৮০০ ড্রাগন গাছ কেটে ফেলেন ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার ‘ড্রাগন প্রিন্স’খ্যাতি পাওয়া ড. আবু বকর সিদ্দিক প্রিন্স। উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নে ২০১৪ সালে শুরু করা ৮ একর জমির ‘কৃষাণ সমন্বিত কৃষি উদ্যোগ’ খামারে তাঁর ছিল ৬ হাজার ড্রাগন গাছ। কৃষি উৎপাদনে ৮০ শতাংশই জৈব সার ব্যবহার করেন তিনি। বিষমুক্ত ফল ও সবজি আবাদ করে খ্যাতি পাওয়া এ শিক্ষিত কৃষক চোখের সামনে দেখেন সম্ভাবনাময় ড্রাগনের সর্বনাশ।
আবু বক্কর সিদ্দিক বলেছেন, অসাধু চাষিরা ফুলে টনিক স্প্রে করেন। এতে ফল বেশ বড় হলেও এক পাশ লাল; অন্য পাশ থাকে সবুজ। মানুষ টাকা দিয়ে বিষ কিনে খেলেও নজরদারি নেই প্রশাসনের।
সারাদেশে অর্গানিক পদ্ধতির ড্রাগন চাষিরা টনিক বন্ধের দাবি জানালেও কেউ শোনেনি। উল্টো কৃষি বিভাগ এটি মোটাতাজাকরণে হরমোন ব্যবহারে উৎসাহ দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
খুলনা অঞ্চলে রহস্যের নাম টনিক
খুলনা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গাসহ এ অঞ্চলের ড্রাগন চাষিদের সঙ্গে আলাপকালে টনিককে বিশাল এক রহস্যঘেরা বস্তু মনে হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তাদের বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ বনে টনিকের গুণাগুণ হাজির করেছেন। আগে টনিক প্রতি লিটার ১০ হাজার টাকা ছিল, এখন ৭-৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্বাভাবিক পদ্ধতির চেয়ে টনিকের ড্রাগন স্বাদ বলেও দাবি তাদের। নিজে কেন ব্যবহার করেন না, জানতে চাইলে অদ্ভুত আকারের সঙ্গে রঙের অজুহাত দাঁড় করিয়ে বিবেককে সামনে আনেন। সাফ জানান, টনিকের বড় ড্রাগনের কাছে আর্থিকভাবে তারা মার খাচ্ছেন সত্য, কিন্তু বিবেকের তাড়নায় ব্যবহার করছেন না।
অবশ্য সূত্রের দাবি, এ অঞ্চলের ৯৫ শতাংশ ড্রাগন চাষি তাঁর ক্ষেতে টনিক ব্যবহার করছেন। কুষ্টিয়ার মিরপুর থানায় মো. আসাদুজ্জামানের দেখাদেখি অন্যরা ড্রাগন চাষে উদ্বুব্ধ হন। তাঁর শিষ্যরা দাবি করেন, আসাদই টনিকের ব্যবহার প্রথম এনেছেন এ অঞ্চলে। অথচ আসাদ সমকালের কাছে তা অস্বীকার করেন। আলাপের এক পর্যায়ে হরমোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ জানালে তিনি উল্টো বলেন, ‘আমাদের চেয়ে কি ভারত কম জানে-বোঝে? তারা কেন ড. ডনসকে থামাচ্ছে না? নিজে খেয়ে দেখেছি, আমার প্রাকৃতিক চাষের ড্রাগনের চেয়ে টনিকেরটি মিষ্ট এবং মজাদার। শুধু এক শ্রেণির মানুষের অপপ্রচারে টনিক নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।’
খুলনা বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টনিক ব্যবহার হচ্ছে ঝিনাইদহে। জেলার ড্রাগন চাষি সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে ৫ হাজার ড্রাগন চাষির ৯৫ শতাংশই ড. ডনস টনিক ব্যবহার করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলার এক চাষি বলেন, সবার সামনে ড. ডন কৃষকের হাতে টনিক তুলে দিয়ে একটি চক্র শত শত কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। কৃষি বিভাগ কখনোই এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়নি। বরং ফল মোটাতাজা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। টনিকের ড্রাগন বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।
ঝিনাইদহ জেলা ড্রাগন চাষি কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসানুল ইসলাম বলেছেন, ‘ভারতেই ড. ডনস টনিকের অনুমোদন নেই। নিষেধ করলেও অতি লোভে চাষিরা ব্যবহার করেছেন। মাত্রাজ্ঞান না থাকায় পরিমাণে বেশি দিচ্ছেন।’
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের জামতলী মোড়ের চুপিরহাটের কৃষি উদ্যোক্তা রুবেল ইসলাম বলেন, বছরের সাত মাস ফল দেওয়া ড্রাগন কৃষকের সোনার ডিম পাড়া হাঁস। এ জন্য তারা পেট কেটে সব ডিম বের করতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন।
নাটোর ড্রাগন ফ্রুটসের পরিচালক মনিরুজ্জামান মুন্না বলেন, টনিক ব্যবহারে প্রথম এক-দুই বছর ভালো ফলন মেলে। পরে কমে যায় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ায় সার ও খাবার বেশি লাগে।
কে এই ড. ডন
বাংলাদেশের অন্তত পাঁচ কৃষিবিজ্ঞানীর কাছে ড. ডনের সম্পর্কে জানতে চেয়ে কোনো তথ্য মেলেনি। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ জানান, তিনি শুনেছেন ড. ডন কলকাতার একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। এখন মেহেন্দীগঞ্জে চাষাবাদ করেন। তিনি প্লানোফিক্স, জিব্রালিক এসিড ও পিজিআর একসঙ্গে মিলিয়ে ওভার ডোজে ককটেলের মতো করে টনিক উদ্ভাবন করেছেন। এটিই বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু এ দেশে সব ধরনের টনিক আমদানি নিষিদ্ধ।
হোয়াটসঅ্যাপ কলে আলাপকালে ড. ডন জানান, তাঁর নাম মদন মোহন দা। দিল্লিতে দীর্ঘদিন থাকায় ডন পরিচিতি পেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে তাঁর ড্রাগন বাগান আছে। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচার রিসার্স ইনস্টিটিউট থেকে এমএসসি ও পিএইচডি করে টিস্যু কালচার নিয়ে কাজ করছেন। মদন মোহন বলেন, নিজের বাগানে ব্যবহার করছি, সমস্যা হচ্ছে না। যা হচ্ছে সবই অপপ্রচার। বাংলাদেশে ফাদার অব ড্রাগন নামে পরিচিত ড. কামরুজ্জামান টনিক ব্যবহার করেন। আমার টনিক ক্ষতিকর নয়, এটি পরীক্ষিত। তবে বাংলাদেশের চাষিরা ব্যবহারবিধি মানছেন না।
অবৈধভাবে একটি দেশে বিক্রি এবং প্যাকেটের গায়ে ব্যবহারবিধি না রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি নিজে গিয়ে বিক্রি করছি না। বাংলাদেশ থেকে এসে নিয়ে যাচ্ছেন। ব্যবহারবিধি তো আমার ভিডিওতে রয়েছে।
যেভাবে ছড়িয়েছে টনিক
বাংলাদেশের উৎপাদিত ড্রাগন যখন বিশ্বজয় করার পথে, ঠিক তখনই একটি চক্র চাষিদের টার্গেট করে। কৌশলে কৃষকদের মাঝে টনিক ব্যবহারের নানা উপকারী দিক তুলে ধরে। সামাজিক মাধ্যমে চালানো হয় প্রচার। অভিযোগ রয়েছে, টনিকের ব্যবসা সফল করতে মদন মোহন হাত করেন ইউটিউবার, কৃষক সংগঠন, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও কীটনাশক ব্যবসায়ীদের। ভারত থেকে এসে দীপেন্দ্র বিশ্বাস উপেন নামের এক ব্যক্তি সারাদেশ ঘুরে ডিলার নিয়োগ করেন। তাঁর সহায়তায় চক্রটি বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ড. ডনের টনিক পৌঁছে দেয়। সেটি ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও নাটোরের একটি গ্রুপ কীটনাশক দোকানদার ও ড্রাগন বাগান মালিকদের হাতে তুলে দেয়।
টনিক বেচাকেনার সঙ্গে নাটোরের কীটনাশক বিক্রেতা এনামুল হক, গোলাম মাওলা, আবদুল হাকিম জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন চাষিরা। বছর দু-এক আগে প্রতি লিটার টনিকের দাম ছিল ১০ হাজার টাকা, এখন ৫ থেকে ৮ হাজার পর্যন্ত। এভাবে মাত্র আড়াই বছরে টনিক বাংলাদেশের ড্রাগন বাগান দখল করেছে। অনলাইন অর্ডারে পৌঁছে যাচ্ছে চাষির হাতে।
ড. ডনস টনিকের একটি মোড়ক সমকালের হাতে এসেছে। এতে মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সিল কিংবা কোনো নির্দেশনা নেই। উৎপাদনের তারিখ বা ব্যবহারবিধিও নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাটোরের এক কৃষি উদ্যোক্তা জানান, কৃষি বিভাগের দুই কর্মকর্তা টনিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এটি প্রবেশে সীমান্তে প্রশাসন মোটা অঙ্কের টাকা নিচ্ছে। ডনের প্রতিনিধি উপেন বাংলাদেশে টনিকের বিক্রি বাড়াতে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মতি বৈঠক করেন। রাজধানীর খামারবাড়িতেও রয়েছে উপেনের নিয়মিত যাতায়াত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদন ও পুষ্টি উন্নয়ন’ প্রকল্পের পরামর্শক এস এম কামরুজ্জামান বলেন, আমি বাগানে ড. ডনের টনিক ব্যবহার করি না। আমি ভারত থেকে চোরাই পথে আসা একটি হরমোন ব্যবহার করি, যাতে কোনো ক্ষতি হয় না। তবে বাংলাদেশে সব ধরনের হরমোন কিংবা টনিক আমদানি নিষিদ্ধ বলে স্বীকার করেন তিনি।
কৃষি বিভাগের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ
টনিক বিতর্কে ড্রাগন বিক্রিতে ধস নামলেও কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের তৎপরতা চোখে পড়েনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ হরমোনযুক্ত ড্রাগনে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই বলে সাফাই করছেন। টনিকের বিরুদ্ধে যারা বলছেন, তাদের শাস্তিও চান তিনি। মেহেদী মাসুদ বলেন, এক দশক ধরে মানুষ ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজন এবং ভেতরে-বাইরে টুকটুকে লাল ড্রাগন দেখে অভ্যস্ত। হঠাৎ করে বড় ড্রাগন নিতে পারছেন না। ‘প্রাকৃতিক হরমোন’ ব্যবহারে বড় আকারের ড্রাগনচাষিদের অধিক মুনাফার পথ সুগম করেছে। টনিক বা ফাইটো হরমোন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এতে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। কিছু অজ্ঞ ইউটিউবারের অপপ্রচারে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. উবায়দুল্লাহ কায়ছার জানিয়েছেন, রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য তারা ড্রাগন ফল ও যে টনিক ব্যবহার করা হচ্ছে তার নমুনা সংগ্রহ করেছেন। এটি ব্যবহারের অনুমতি নেই। টনিকের ফল খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক ড. মোক্তার হোসেন বলেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত যে কোনো পণ্যেরই স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। হরমোন ব্যবহারের কোনো অনুমোদন বাংলাদেশে নেই।
এ ছাড়া গত ১২ ডিসেম্বর অংশীজন বৈঠক করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। বৈঠকে হরমোনযুক্ত ড্রাগন ফল একাধিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সংস্থাটির সদস্য (আইন ও নীতি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, হরমোনবিহীন, একবার ও একাধিকবার হরমোন দেওয়া ড্রাগন সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখব এতে পুষ্টিগুণের পরিবর্তন কিংবা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিছু আছে কিনা? হরমোনবিহীন ড্রাগন ৮০ শতাংশ খাওয়া যাচ্ছে, বাকি ২০ ভাগ খোসা। অন্যদিকে টনিকের বড় ড্রাগন সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ খাওয়া সম্ভব হচ্ছে, ৪০ শতাংশ খোসা বাদ চলে যাচ্ছে

















