বেড়েছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

দেশে এসি ফ্রিজের নকল গ্যাস আসছে চীন থেকে

24

নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দেশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এয়ার কন্ডিশনার বা এসি) ও রেফ্রিজারেটরের (ফ্রিজ) নকল গ্যাস নিয়ে আসছে একটি সিন্ডিকেট। চীন থেকে আনা এই গ্যাস ব্যবহারের কারণে এসব বৈদ্যুতিক যন্ত্র বিস্ফোরণের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দুই কনটেইনার গ্যাসের চালান পরীক্ষা করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এসি ও ফ্রিজে ব্যবহার করা গ্যাসের ১০টি কনটেইনার আটক করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। আরও প্রায় ৫০ কনটেইনার নকল গ্যাসের চালান পাইপলাইনে আছে বলে শুল্ক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

Advertisement

সূত্র জানায়, গত ৮ জুন চীন থেকে এসি ও রেফ্রিজারেটরের জন্য ব্যবহৃত গ্যাসের পণ্য চালান নিয়ে আসে রাজধানীর নিশাত ট্রেডার্স। চীনের যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এই গ্যাস আনা হয় তার সঙ্গে ফ্রান্সের বিশ্ববিখ্যাত গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফরেনের নামের মিল রয়েছে। আবার ফ্রান্সের ওই কোম্পানির চীনেও কারখানা রয়েছে। তবে মূল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এসি-ফ্রিজের গ্যাস আমদানি না করে ব্র্যান্ড জালিয়াতি করে নকল পণ্য নিয়ে এসেছে নিশাত ট্রেডার্স। এ ছাড়া আরও বেশকিছু বাণিজ্যিক আমদানিকারক এই ধরনের নকল পণ্য আমদানি করেছে।

জানা গেছে, মূল ফরাসি প্রতিষ্ঠানের নামের বানান হবে এফওআরএএনই। কিন্তু নিশাত ট্রেডার্স যেখান থেকে পণ্য এনেছে, সেই কোম্পানির নামের বানান এফওআরএএন। দুই কোম্পানির গ্যাসের মান ও মূল্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ ছাড়া এসি-ফ্রিজের গ্যাস আমদানিতে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে এসব পণ্য চালান আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে কোন কোম্পানি থেকে এসব পণ্য আনা যাবে, তাও উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু কিছু আমদানিকারক বেশি লাভের আশায় সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিবেচনায় না নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নকল গ্যাসের চালান নিয়ে আসছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাজধানীর নিশাত ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটি এই গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কোনো নীতিমালাও অনুসরণ করেনি।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের নীতিমালায় বলা আছে, গ্যাস জাতীয় পণ্য আমদানিতে পণ্য চালানের বিস্তারিত তথ্য কার্টনে উল্লেখ থাকতে হবে। কোম্পানির লেবেল থেকে শুরু করে উৎপাদনকারী কোম্পানি সম্পর্কিত তথ্যও কার্টনে উল্লেখ থাকতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নকল গ্যাস আমদানির বিষয়ে রাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাথমিক তথ্য পেয়ে অনুসন্ধানে নামে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। তাদের সঙ্গে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও পরীক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। প্রাথমিকভাবে দুটি কনটেইনার পরীক্ষা করে নকল গ্যাস আমদানির প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে এ ধরনের গ্যাসের প্রায় ১০ কনটেইনার পণ্য চালানে লক বা আটক আছে। আরও প্রায় ৫০টি কনটেইনার খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্র।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ‘এসি-ফ্রিজের গ্যাস আমদানি করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে আমদানি করতে হয়। বাণিজ্যিক এসব আমদানিকারক তা মানেন না। এ ছাড়া যে ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকে গ্যাস আনা যাবে, সেখান থেকে না এনে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে ডুপ্লিকেট পণ্য নিয়ে এসেছে, যা জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ কারণে এসির জন্য নিয়ে আসা গ্যাসের বেশ কিছু চালান আমরা আটক করেছি। একই সঙ্গে বিষয়টি যেহেতু টেকনিক্যাল, তাই বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’

সূত্র জানায়, রাজধানীর জয়কালী মন্দিরের নিশাত ট্রেডার্স ২৮ হাজার ৯৭১ ডলার মূল্য ঘোষণায় গ্যাসের চালান নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া গত ৮ জুন রাজধানীর ইসলামপুরের আরেক আমদানিকারক এশিয়ান রেফ্রিজারেশন ওয়ার্কস ৩২ হাজার ৩ ডলার মূল্যের ফ্রিজের গ্যাস আমদানি করেছে। এতেও নকল গ্যাস থাকার প্রমাণ পেয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তারা। এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পণ্য চালান আটকে দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

যোগাযোগ করা হলে নিশাত ট্রের্ডাসের স্বত্বাধিকারী রেজাউল করিম বলেন, ‘ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশে কোনো এসি-ফ্রিজের গ্যাস আমদানি হয় না। আমরা সাধারণত চীন থেকে গ্যাস আমদানি করি। অরজিনাল কোম্পানির গ্যাসের সঙ্গে আমাদের আমদানি করা গ্যাসের মিল না থাকলেও, এটা নকল নয়। কেউ হয়তো নকল গ্যাস আমদানি করেছে, যার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ আটক করেছে।

সব রকম টেস্টে এই গ্যাস সঠিক প্রমাণ হবে বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি বিস্ফোরক অধিদপ্তরের নিয়ম না মানার বিষয়টিও অস্বীকার করেন।

প্রতিষ্ঠানটির মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ আনশিয়া ওভারসিজের মালিক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যেসব ডকুমেন্ট দিয়েছে, সে অনুযায়ী আমরা পণ্য খালাসের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্য চালান আটকে দিয়েছে। শুনেছি এ ধরনের আরও পণ্য চালান আটক করা হয়েছে।’

এয়ার কন্ডিশনারের কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে দেশে এসিতে যে গ্যাস ব্যবহার করা হয়, তাতে গ্যাসে সহজে আগুন ধরে যায়। ফলে কোনো কারণে সেটি লিক হয়ে জমে থাকলে, সেখানে বৈদ্যুতিক কারণে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হলে বা ম্যাচের কাঠি জ্বালানো হলে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই দামি এই যন্ত্রটি কেনার আগে বিশেষ সতর্ক হওয়া উচিত, যাতে নকল কিনে ঠকতে না হয়।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, সম্প্রতি দেশে এসি বিস্ফোরণের হার বেড়ে গেছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবারও চিকিৎসার জন্য রাজধানীতে এসে এসি বিস্ফোরণের শিকার হয়েছে একটি পরিবার। এ ঘটনায় এক শিশু মারা গেছে। দুজনের ৫০ শতাংশ পুড়ে গেছে।

এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে এসি ও ফ্রিজে মানসম্মত গ্যাস ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement