পূর্ব রেলের চীফ ইঞ্জিনিয়ার কমিশন নেন টেন পার্সেন্ট!

117

প্রকৌশলী আবু জাফর মিঞা ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার দখল করেন। এরপরপরেই তিনি নামসর্বস্ব প্রকল্পের নামে করেন নানা অনিয়ম-দুর্নীতি। অতি লোভনীয় এই পদে আসীন হয়ে তিনি রাতারাতি বনে যান কোটিপতি।

Advertisement

যদিও অভিযোগ আছে বিগত স্বৈরাচার আওয়ামীলীগ সরকারের চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম দোসর হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের শক্তিতে রেলে মামলা-হামলা আর দখল দারিত্বে মেতে উঠেন কথিত ব্যবসায়ি শাহ আলম। আর তাদের সঙ্গে যোগদিয়ে নামসর্বস্ব প্রকল্পের নামে কমিশন বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকার মালিক হন রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিঞা।

জানা যায়, আওয়ামীলীগ সরকারের গত ১৫ বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের বাজেট পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। যার ৯০ শতাংশ নতুন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেয় বিগত সরকার। তখন এই অর্থ প্রকৌশল বিভাগের কথিত নানা প্রকল্প দেখিয়ে লুটপাট করেন আওয়ামী ঘরানার কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাদের মধ্য সবচেয়ে আলোচিত সুবিধাভোগী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে আবু জাফর মিঞার ভূমিকা ছিল অন্যতম।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, আবু জাফর মিঞার ইশারায় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগে দূর্দান্ত গতিতে চলছে দুর্নীতি। বিভিন্ন প্রকল্পে ৫% থেকে ২০% পর্যন্ত কমিশন নিয়েই তিনি এই পর্যন্ত কয়েকশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন, রেল ভবন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেরও ঠিকাদাররা দিয়েছেন অভিযোগ। কমিশন আদায়ে তিনি এতটাই বেপরোয়া যে, নগদ আদায় ছাড়া ফাইলে সই করেন না।

সূত্র জানায়, ঘুষ আর কমিশন ছাড়া কিছুই বুঝেন না এই প্রধান প্রকৌশলী। ফাইল পাসের নামে প্রতিনিয়ত হাতিয়ে নিচ্ছেন ১০ পারসেন্ট কমিশন। সংঘবদ্ধ চক্র ছাড়া পূর্ব রেলে কোনো ঠিকাদার সহজে কাজ পায়না। একের পর এক ঠিকাদারি কাজ ভাগিয়ে নিচ্ছেন তার চক্রের লোকজন। এককথায় সংঘবদ্ধ প্রকৌশলী-ঠিকাদার সিন্ডিকেটে জিম্মি এই দপ্তর।

রেলওয়ের এক ঠিকাদার জানান, ১ আগস্ট ২০২৪ এ প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিঞার বরাবরে চট্টগ্রামের মার্শালিং ইয়ার্ডে Saloon shed নির্মাণের জন্য কোনো প্রকার বিজ্ঞপ্তি ছাড়া সেতু প্রকৌশলী (পূর্ব) দরপত্র আহ্বান করেন। ১০ শতাংশ কমিশন নিয়ে প্রায় কোটি টাকার কাজটি তখন প্রধান প্রকৌশলী তার ক্ষমতাবলে তার বিশ্বস্থ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শামীম এন্ড ব্রাদার্সকে দিয়ে দেন। অথচ কোন প্রয়োজন ছাড়াই চট্টগ্রামের মার্শালিং ইয়ার্ডের Saloon shed নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল বিভাগ।

প্রয়োজন ছাড়া এই প্রকল্প দেখিয়ে সরকারের টাকা আত্মসাত করেছেন আবু জাফর। এভাবে তিনি আরও অনেকগুলো প্রকল্প তৈরি করে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাত করেছেন। দুর্নীতির টাকায় নিজের এলাকা ফরিদপুর জেলার ভাংগা থানায় শত শত বিঘা জমি ক্রয় করেছেন তিনি। পাশাপাশি বিদেশেও টাকা পাচার করার অভিযোগ আছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। নামে বেনামে ফ্ল্যাট-প্লটও কিনেছেন তিনি। নিজের স্ত্রী ও আত্মীয় স্বজনের নামে আছে এফডিআর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদাররা বলেন, মোটা অংকের কমিশনে জাফর মিঞার পছন্দের গুটি কয়েক ঠিকাদার ঘুরে ফিরে কাজ করছেন। এতে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত নিম্ন দরদাতা ঠিকাদাররা। ওপেন টেন্ডারের নামে গোপন ফাইল তৈরী, প্রকাশিত টেন্ডার অতি চালাকির সহিত পারচেজ করাসহ ইজিপি ও আরএফকিউতে শুধুমাত্র কমিশন বানিজ্য হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। প্রতিটি কাজে আবু জাফর মিঞার হয়ে কাজ করেন তার অধিনস্ত প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী, টিএসও, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, ঊর্ধ্বতন সহকারী প্রকৌশলীসহ আরো অনেকে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জাফর মিঞার সিন্ডিকেটের ঠিকাদার ছাড়া অন্য কেউ ঠিকাদার টেন্ডারে অংশ নিতে পারে না বা নেওয়ার সাহস করে না। তিনি এতটাই প্রভাবশালী যে স্বৈরাচার সরকারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হওয়ায় তাকে ভারতকে পূর্বাঞ্চলের করিডোর হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মিত আখাউড়া-আগরতলা রেল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেন বিগত আওয়ামী সরকার।

জানা যায় যে, শেখ হাসিনার সাথে জাফর মিয়া যতবার দেখা করতেন ততবারই তার পদধূলি মাথায় নিতেন। তার পদে কোন কর্মকর্তা আসার চিন্তা করলেই তাকে তিনি বিএনপি-জামায়াত হিসেবে চিহ্নিত করে তার পদায়ন ঠেকিয়ে দিতেন। এই কর্মকর্তা আখাউড়া -আগরতলা প্রকল্প এবং গেট কিপার নিয়োগেও তিনি কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রেলের সাবেক মন্ত্রীকে ১ কোটি এবং সাবেক ডিজি কামরুল ইসলামকে ১ কোটি করে মোট ২ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে ২ বছর আগে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে বদলী হয়ে আসেন আবু জাফর মিঞা। তার এ বলয়ে রয়েছেন তার একটি শক্তিশালী সিণ্ডিকেট, যারা নানা জাল-জালিয়াতিতে জড়িত।

রেলওয়ের একজন প্রকৌশলী বলেন, প্রকৌশল বিভাগের সকল কাজ প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশে তার পছন্দের ঠিকাদারদের দেয়া হচ্ছে। যে কোন কাজের প্রাক্কলন অনুমোদন দেয়ার পর পরই প্রধান প্রকৌশলী নির্ধারিত ঠিকাদারের কাছ থেকে ডিজি, মন্ত্রী বা সচিবের কথা বলে ১০% থেকে ১৫% টাকা অগ্রীম নিয়ে নেন, এবং টেন্ডার আহবানকারী নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন যেন এ ঠিকাদারকে কাজটি দেয়া হয়। তিনি তার নির্ধারিত ঠিকাদারকে অন্যান্যদের নিকট ডিজি বা মন্ত্রীর লোক বলে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন।

এক ঠিকাদার বলেন, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রকৌশল দপ্তরের সকল টেন্ডার প্রক্রিয়া তদন্ত করার জন্য ঠিকাদাররা রেলের সাবেক ডিজি কামরুল ইসলাম ও দুদক বরাবরে আবেদন করলেও কোন তদন্ত এখনো পর্যন্ত আলোর মূখ দেখেনি।

তিনি আরও বলেন, রেলের ডিজি সরদার সাহাদত আলী ও সাবেক স্বৈরাচার সরকারের মন্ত্রী জিল্লুল হাকিম দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের ম্যানেজ করার নামে প্রধান প্রকৌশলী ও তার সিন্ডিকেট কয়েক কোটি টাকা চাঁদাবাজী করেছেন ঠিকাদারদের কাছ থেকে। চট্টগ্রামের রেলওয়েতে সবার মুখে মুখেমুখে শুনা যায় মন্ত্রী-সচিব ও ডিজি আসে যায় কিন্তু লুটেরা চক্রের প্রধান আবু জাফর মিঞার কোনো কিছুই হয় না।

এবিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কল দেওয়া হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আবু জাফর মিঞাকে। তবে তিনি সাড়া না দেওয়ায় কোনো বক্তব্য মিলেনি।

দ্বিতীয় পর্বে আসছে- শক্তি বাবরের, উচ্চ আদালতে সাজানো রিটে রেলের সম্পদ দখলে নেন শাহ আলম!

Advertisement