বাংলার আকাশে কিছু কিছু দিন আছে, যেদিন সময় যেন শুধু ঘড়ির কাঁটায় নয় মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে ধ্বনিত হয়। ১০ মাঘ তেমনই এক দিন। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়; এটি উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়, মানবতার এক মহান সাধকের স্মৃতিবিজড়িত মাহেন্দ্রক্ষণ। হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি কেবলা (কঃ) এর বার্ষিক ওরস শরিফ এই দিনে পরিণত হয় আত্মার মিলনমেলায়, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সামাজিক ভেদাভেদ অতিক্রম করে মানুষ একত্রিত হয় আল্লাহর প্রেমে।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার শরীফ শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি যুগ যুগ ধরে মানুষের আত্মিক আশ্রয়স্থল। পবিত্র মাইজভান্ডার শরীফ খোদা তালাশীদের জন্য মহান এক সাধনা স্থল। এখানে এসে ক্লান্ত হৃদয় প্রশান্তি খুঁজে পায়, বিচলিত আত্মা ফিরে পায় স্থিতি, আর বিভ্রান্ত মানুষ পায় পথের দিশা। হযরত মাইজভান্ডারি কেবলা (রহ.) ছিলেন সেই বিরল সাধক, যাঁর দাওয়াত ছিল নীরব কিন্তু গভীর, যাঁর শিক্ষা ছিল সরল কিন্তু সুদূরপ্রসারী।
হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি কেবলা (রহ.) এর পূর্ণ নাম হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি (কঃ)। তিনি এমন এক সময়ে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, যখন মুসলিম সমাজ নানা সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল। উপনিবেশিক শাসনের চাপ, ধর্মীয় অবক্ষয়, নৈতিক দুর্বলতা ও আত্মিক শূন্যতা মানুষের জীবনকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছিল। এই প্রেক্ষাপটে তিনি আবির্ভূত হন আল্লাহর রহমতের প্রতীক হয়ে একজন মুর্শিদ, যিনি মানুষের অন্তরকে জাগ্রত করার সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
তাঁর দাওয়াতের মূল ছিল আত্মশুদ্ধি। তিনি মানুষকে বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়েও অন্তরের পরিশুদ্ধির দিকে আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য প্রয়োজন অহংকার ভাঙা, হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করা এবং মানবসেবাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা। এই দর্শনই তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অমর করে রেখেছে।
হযরত মাইজভান্ডারি কেবলা (কঃ) কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য নয় তিনি ছিলেন সকলের। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শহুরে-গ্রাম্য সবার জন্য তাঁর দরবার ছিল উন্মুক্ত। তাঁর খানকাহ ছিল এমন এক মিলনস্থল, যেখানে মানুষ নিজেকে মানুষ হিসেবে নতুন করে আবিষ্কার করত। এখানেই তাঁর আধ্যাত্মিক বিপ্লবের বীজ রোপিত হয়েছিল নীরবে, ধীরে, কিন্তু গভীরভাবে।
১০ মাঘের ওরস শরীফ সেই বিপ্লবের মহান এক স্মরণোৎসব। এই দিনে লক্ষ লক্ষ আশেক, ভক্ত ও অনুরাগী মাইজভান্ডার শরীফে সমবেত হন। কিন্তু এই সমাবেশ কেবল জনসমাগম নয়; এটি আত্মার সমাবেশ। কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার মধ্য দিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে নূরানী। প্রতিটি হৃদয়ে ধ্বনিত হয় আল্লাহর নাম, প্রতিটি চোখে জ্বলজ্বল করে ভালোবাসার অশ্রু।
ওরশ শব্দটির অর্থই মিলন। এটি কোনো শোকানুষ্ঠান নয়; বরং প্রিয়তমের সঙ্গে প্রিয় বান্দার মিলনের স্মরণ। হযরত মাইজভান্ডারি কেবলা (কঃ) এর ওরছ তাই আনন্দের, কৃতজ্ঞতার ও আত্মিক উপলব্ধির দিন। এই দিন মানুষ উপলব্ধি করে জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য ও ভালোবাসা চিরস্থায়ী।
হযরত মাইজভান্ডারি কেবলা (কঃ) এর শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বিশ্বে যখন সহিংসতা, হানাহানি ও মানবিক অবক্ষয় ক্রমেই বাড়ছে, তখন তাঁর “মুহাব্বতে ইলাহী ও খিদমতে খালক” আল্লাহর প্রতি প্রেম ও সৃষ্টির প্রতি সেবা এই দর্শন মানবজাতির জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। তিনি শিখিয়েছেন, ধর্ম কখনো বিভেদের দেয়াল নয়; বরং এটি মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে।
মাইজভান্ডারি দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মসমালোচনা। তিনি মানুষকে অন্যের দোষ খোঁজার পরিবর্তে নিজের ভেতর তাকাতে শিখিয়েছেন। তাঁর মতে, নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ না করে সমাজ পরিবর্তনের দাবি করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়। এই আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে কেবল একজন সুফি সাধক নয়, বরং একজন সামাজিক সংস্কারকে পরিণত করেছে।
১০ মাঘের ওরস শরীফে এই শিক্ষাগুলো নতুন করে উচ্চারিত হয়। প্রবীণ আশেকের অভিজ্ঞতা ও নবীন প্রজন্মের অনুসন্ধান একসূত্রে মিলিত হয় এই দিন। মাইজভান্ডার শরিফ হয়ে ওঠে প্রজন্মের সেতু যেখানে অতীতের সাধনা ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা একত্রে ধ্বনিত হয়।
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, হযরত মাইজভান্ডারি কেবলা (কঃ) এর খানকাহভিত্তিক আন্দোলন উপমহাদেশের সুফি ধারায় একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেছে। তাঁর অনুসারীরা শুধু আধ্যাত্মিক চর্চায় নয়, সামাজিক সেবায়ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। শিক্ষা, মানবসেবা, নৈতিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে মাইজভান্ডারি আদর্শ আজও অটল।
ওরস উপলক্ষে মাইজভান্ডার শরিফ ও আশপাশের অঞ্চল পরিণত হয় এক অনন্য মানবিক উৎসবে। এখানে কোনো আনুষ্ঠানিক আড়ম্বর নেই, নেই কৃত্রিমতা। আছে শুধু ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও আত্মিক টান। একবাটি তবাররুক ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও যে আত্মীয়তা গড়ে ওঠে, তা আধুনিক সভ্যতার অনেক জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনেও অনুপস্থিত।
১০ মাঘ তাই কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মপর্যালোচনার দিন। এই দিনে মানুষ নিজের জীবনের হিসাব নেয় আমি কতটা মানবিক, কতটা বিনয়ী, কতটা আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন? হযরত মাইজভান্ডারি কেবলা (কঃ) এর জীবন ও শিক্ষা এই প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে সহায়তা করে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি কেবলা (কঃ)এর ওরশ শরীফ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার পদে নয়, তার হৃদয়ে। ক্ষমতা, সম্পদ বা খ্যাতি নয়; বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধই একজন মানুষকে সত্যিকারের মহান করে তোলে।
১০ মাঘের এই পবিত্র দিনে সেই মহান সাধকের রূহানি দৃষ্টিতে নতুন করে নিজেদের জীবনকে পরিমাপ করার সুযোগ আসে। মাইজভান্ডারের আকাশে তখন শুধু বাতাস নয় ভাসে দোয়া, জিকির আর মানুষের অন্তর থেকে উঠে আসা এক নিঃশব্দ আকুতি হে আল্লাহ, মহান গাউছুল আজম এর উসিলায় আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন, আমাদের কে হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি কেবলার আদর্শে নিজের জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন।
লেখকঃ সৈয়দ মোহাম্মদ আসিফ কামাল, নায়েবে মোন্তাজেম, দরবারে কামালিয়া শরীফ।

















