৩০শে মে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি শোকাবহ দিন। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর এই প্রয়াণ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতার বিদায় ছিল না, বরং তা ছিল দেশের এক ক্রান্তিলগ্নে এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ককে হারানো।
এক সৈনিকের রাজনৈতিক উত্থানঃ জিয়াউর রহমান ছিলেন একাধারে একজন সফল সামরিক কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় জননেতা। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিগভ্রান্ত জাতিকে মুক্তির দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়ক হিসেবে তাঁর বীরত্বগাথা বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তনঃ পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে জিয়াউর রহমান দেশ গঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি একদলীয় শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং মানুষের বাক-স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি গণতান্ত্রিক ধারায় দেশ পরিচালনার ভিত্তি স্থাপন করেন।
উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার রাজনীতিঃ জিয়াউর রহমানের দর্শন ছিল ‘উৎপাদনের রাজনীতি’। তিনি বিশ্বাস করতেন, তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করতে হলে কৃষির উন্নয়ন জরুরি। তাঁর সময়ে নেওয়া উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো:
খাল খনন কর্মসূচি: কৃষিকাজে সেচ সুবিধার জন্য দেশব্যাপী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খনন।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ: খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: গণশিক্ষা কার্যক্রম শুরু এবং গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া।
দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা: সার্ক (SAARC)-এর স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ।
১৯ দফা কর্মসূচি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদঃ জিয়াউর রহমান কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নই করেননি, তিনি জাতিকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এদেশের মানুষের মাঝে এক গভীর ঐক্য ও দেশপ্রেমের চেতনা জাগ্রত করে। তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল মূলত একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা।
শেষ কথাঃ শহীদ জিয়াউর রহমান তাঁর সততা, সাধারণ জীবনযাপন এবং কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে ‘শহীদ জিয়া’ হিসেবে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমন ছিলেন অনাড়ম্বর, রাষ্ট্রীয় জীবনে ছিলেন তেমনই আপসহীন। আজকের এই দিনে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শপথ নেওয়া প্রয়োজন—একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তাঁর আদর্শকে বুকে ধারণ করার।
“ব্যক্তি চলে যায়, কিন্তু আদর্শ রয়ে যায়।”—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম আজও বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রেরণার উৎস।
















