বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে নতুন সংকটে পড়েছে দেশের চা শিল্প। বিদ্যুৎ না থাকায় বাগান থেকে উত্তোলিত কাঁচা চা-পাতার অর্ধেকের বেশি পঁচে বা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অথবা মান কমে যাচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এ বছর বাগানে চা-পাতার প্রাচুর্য অপেক্ষাকৃত বেশি হলেও বাজারজাতযোগ্য চায়ের পরিমাণ কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন উৎপাদক ও প্রক্রিয়াজাতকারীরা।
খাত সংশ্লিষ্টরা, লোডশেডিংয়ের সময়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন কিছুটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হলেও তাতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এটি দীর্ঘায়িত হলে বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাবে দেশের চা শিল্প। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে চা প্রক্রিয়াজাত করার পরিমাণ কমে যাওয়া অব্যাহত থাকলে রপ্তানিও কমে যাবে।
বাংলাদেশ চা-বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড়সহ ৭-৮টি জেলায় ১৭২টি চা-বাগান রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে সরকারের অংশীদারিত্ব রয়েছে। বেশির ভাগই বেসরকারি। দেশে ২০২৫ সালে চা উৎপাদন হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি, যা ২০২৪ সালের ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজি থেকে প্রায় ১৯ লাখ কেজি বেশি। তবে ২০২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি। এ বছরও গত বছর থেকে উৎপাদন লক্ষ্য বেশি।
মৌলভীবাজার ও পঞ্চগড়ে অবস্থিত পৃথক চারটি চা-বাগানের কর্মকর্তারা জানান, মার্চ থেকে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত বাগান থেকে চা পাতা তোলা হয়। এ বছর চা পাতার ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু গত দেড় মাস ধরে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় বিদ্যুৎ থাকে না। মেশিন বন্ধ রাখতে হয়। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বার্ষিক চা উৎপাদন অর্ধেকে নেমে যাবে এবং চা রপ্তানিতে ধস নামবে।
বর্তমানে দেশে তীব্র গরমের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু জ্বালানি ঘাটতি, গ্যাসসংকট ও কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে ঘাটতি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের জেলাতেই লোডশেডিং হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার পিক আওয়ারে সাব স্টেশন পর্যায়ে বিদ্যুতের লোডশেডিং প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
চা-বাগানে বিদ্যুৎ সরবরাহ কেমন
ন্যাশনাল টি কোম্পানির আওতাধীন সাতটি চা-বাগানের মধ্যে চণ্ডিছড়া, জগদীশপুর, তেলিয়াপাড়া ও পারকুল চা-বাগানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। প্রেমনগর, লাক্কাতুড়া ও বিজয়া চা-বাগানে সরবরাহ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিদ্যুৎ বিতরণকারী দুই সংস্থা এবং ন্যাশনাল টি কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার চণ্ডিছড়া চা-বাগানে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। এর আগে বুধবারে প্রায় ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। ঐ দিন জগদীশপুরে পৌনে ৯ ঘণ্টা, তেলিয়াপাড়ায় সাড়ে ৮ ঘণ্টা, পারকুলে সাড়ে ১২ ঘণ্টা, প্রেমনগরে ৪ ঘণ্টা, লাক্কাতুড়ায় ৫ ঘণ্টা এবং বিজয়া চা-বাগানে প্রায় ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। দেশের প্রায় সব চা-বাগানই কমবেশি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি এখন।
দুইটি চা-বাগানের মালিক ও ব্যবস্থাপকরা জানান, সবুজ চা-পাতা খুবই পচনশীল কৃষিপণ্য। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত করতে না পারলে তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কাঁচা পাতা তোলার পর দ্রুত উইদারিয়, রোলিং, ফারমেন্টেশন, ড্রাইং ও সর্টিং করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব কাজ না হলে পাতার গুণগত বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়, রং ও সুগন্ধ কমে যায়, এমনকি পুরো ব্যাচ বাতিলও হতে পারে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সময়মতো উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব না হওয়ায় বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাতা ইতিমধ্যে নষ্ট হয়েছে এবং উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে উৎপাদিত চায়ের গুণমান বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে চায়ের মূল্য কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া উৎপাদন কমে গেলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ চাপ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে এখন অধিকাংশ চা দেশেই ব্যবহৃত হয়, ফলে উৎপাদন ঘাটতি হলে আমদানির চাপও বাড়তে পারে।
এ প্রসঙ্গে চণ্ডিছড়া চা-বাগানের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. শামসুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন কমছে। জেনারেটর দিয়ে যতটুকু সম্ভব উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। বরং খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় উত্তোলিত চায়ের বড় অংশের মান ঠিক রাখা যাচ্ছে না। সার্বিকভাবে চা-শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জেনারেটরে ব্যয় বাড়ছে
অনেক চা-বাগান এখন ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে। তবে এতে উৎপাদন খরচ দ্রুত বাড়ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, মাঝারি একটি কারখানায় দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালাতে দিনে ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল খরচ হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি বড় চাপ। বিদ্যুৎ চলে গেলে একদিকে পাতা নষ্ট হয়, অন্যদিকে জেনারেটর চালিয়ে খরচ বাড়ে। এছাড়া বিদ্যুৎ না থাকলে কারখানা বন্ধ রাখতে হয় অনেক সময়। এতে শ্রমঘণ্টা কমে যায়, শিফট এলোমেলো হয়, অতিরিক্ত সময় কাজের চাপ পড়ে। উৎপাদন কমলে বাগানগুলোর আয় কমে যায়।















