যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী লিমন-বৃষ্টিকে কীভাবে হত্যা করা হয়, উঠে এলো তদন্তকারীর ভাষ্যে

39

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) দুই মেধাবী বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টির মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করেছেন তদন্তকারীরা।

Advertisement

গত ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে যে রহস্যের দানা বেঁধেছিল, লিমনের মরদেহ উদ্ধার এবং তার রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়েহকে গ্রেপ্তারের পর সেই ঘটনার নেপথ্যের লোমহর্ষক তথ্যগুলো সামনে আসছে। আদালতের নথিপত্র এবং পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ড ছিল অত্যন্ত নৃশংস এবং পরিকল্পিত।

তদন্তকারীদের বর্ণনায় জানা যায়, গত ১৬ এপ্রিল সকালে লিমনকে তার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কাছের বাসায় এবং বৃষ্টিকে ক্যাম্পাসের একটি ভবনে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। ১৭ এপ্রিল তাদের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই তদন্ত শুরু করে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়। গত শুক্রবার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড সেতু থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে লিমনের শরীরে ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা থেকে স্পষ্ট হয় যে তাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।

হিলসবরো কাউন্টি আদালতের নথিতে প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, লিমনের রুমমেট হিশামই এই দ্বৈত হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা। তদন্তকারীরা লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ রক্তের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন। পুলিশের ধারণা, লিমনকে হত্যার পর বৃষ্টিকেও একই স্থানে বা একইভাবে হত্যা করা হয়েছে, যদিও বৃষ্টির মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের পরিমাণ দেখে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে বৃষ্টি বেঁচে নেই। অভিযুক্ত হিশামের বিরুদ্ধে প্রাক-বিচার আটকাদেশের আবেদনে এই অপরাধের গুরুত্ব এবং পাওয়া তথ্যপ্রমাণগুলো বিশদভাবে তুলে ধরেছে পুলিশ।

নিহত জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি কেবল সহপাঠীই ছিলেন না, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের গভীর সম্পর্ক ছিল। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানান, তারা বিয়ের কথা ভাবছিলেন এবং গ্রীষ্মের ছুটিতে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনাও ছিল তাদের। লিমন ফল ২০২৪ সেমিস্টার থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে গবেষণা করছিলেন এবং বৃষ্টি ছিলেন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিক্ষার্থী। মেধাবী এই দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সমাজ এবং তাদের দেশের বাড়িতে।

এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লিমনের বন্ধু ওমর হোসেন বলেন, ‘এটি আমাদের কাছে অকল্পনীয় এবং প্রচণ্ড ধাক্কার মতো ছিল।’ লিমনের পরিবার শুরু থেকেই নিখোঁজের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিল এবং সত্য জানার জন্য অপেক্ষা করছিল। বৃষ্টির ভাই জাহিদ প্রান্তও শোকার্ত কণ্ঠে বলেন, ‘সে ছিল একজন নিখুঁত বোন এবং পরিবারের আদর্শ সন্তান। দেশের জন্য বড় কিছু করার স্বপ্ন ছিল তার।’ তদন্তের এই পর্যায়ে পুলিশ অভিযুক্তের কাছ থেকে আরও তথ্য আদায়ের চেষ্টা করছে যেন বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবার এক যৌথ বিবৃতিতে অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তারা সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এই আইনি প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার এবং বিচারের শেষ পর্যন্ত সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া লিমনের মরদেহ ও তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো এবং বৃষ্টির সন্ধান পাওয়ার পর ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও তুলেছেন তারা। শোকাতুর পরিবারের সদস্যরা এখন শুধু চান সত্যের উন্মোচন এবং খুনি যেন আইনের হাত থেকে কোনোভাবেই পার না পায়।

Advertisement