চট্টগ্রামে ৩ দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা’র উদ্বোধন

আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম ক্ষেত্র হল জনবান্ধব ভূমিসেবা: বিভাগীয় কমিশনার

134

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোঃ জিয়াউদ্দীন বলেছেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় জনগণের ভোগান্তি লাঘবে ‘জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষিত ভূমি, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’ স্লোগানকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার ও ভূমি মন্ত্রণালয় সারাদেশে একযোগে ৩ দিন ব্যাপী (১৯-২১ মে) ভূমিসেবা মেলা’র আয়োজন করেছে। আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম একটি ক্ষেত্র হল জনবান্ধব ভূমিসেবা। বাংলাদেশে বেশ কিছু সেবা ডিজিটালাইজড হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক সেবা নিতে এখন আর অফিসে যেতে হয় না। ভূমি সংক্রান্ত সেবা পেতে জনগণকে যাতে অফিসে যেতে না হয় এবং সুবিধামত সময়ে একটি ডিভাইস ব্যবহার করে সহজেই সেবাগুলো নিতে পারেন সে লক্ষ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ আমাদের অফিসগুলো কাজ করে যাচ্ছে।

Advertisement

আজ ১৯ মে মঙ্গলবার সকালে ঢাকার তেজগাঁওয়ের ভূমি ভবন থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারাদেশের সাথে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ৩ দিনব্যাপী ‘ভূমিসেবা মেলা’র শুভ উদ্বোধন শেষে চট্টগ্রাম প্রান্তে সার্কিট হাউজের সামনে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে, ফিতা কেটে এবং বর্ণাঢ্য র‌্যালির মাধ্যমে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ‘ভূমিসেবা মেলা’র শুভ উদ্বোধন শেষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মেলায় ৫ জন ভূমিহীনকে কৃষি খাসজমি বন্দোবস্তের কবুলিয়ত ও সেবা প্রত্যাশীদের হাতে খতিয়ান বিতরণ করা হয়। মুহাম্মদ শওকত আলম নামে একজন বয়স্ক ব্যক্তি হাটহাজারীর ‘মাইজপট্টি’ মৌজার স্থলে ‘ফটিকা’ মৌজা লিখে বি.এস ও আর.এস খতিয়ানের জন্য আবেদন করে না পেয়ে ভূমিসেবা মেলায় এসে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জানান। পরে ঐ ব্যক্তি থেকে ‘মাইজপট্টি’ মৌজার আবেদন নিয়ে ভূমি কর্মকর্তাদেও সহযোগিতায় তাৎক্ষণিক খতিয়ান দু’টি গ্রহণ করেন জেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের আওতায় ‘অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা সিস্টেম ঃ পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা-শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। পরে মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।

আগামী ২১ মে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় বারোয়ারী বিতর্ক, পুরস্কার বিতরণী, ভূমি জনসচেতনতামূলক সাংস্কৃতিক ও মেলার সমাপনী অনুষ্ঠান। সমাপনী অনুষ্ঠানে ভূমি মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

আলোচনা সভা ও সেমিনারে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, এই মেলার মাধ্যমে আমরা ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় সেবা হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছতার সাথে প্রদান করবো। মেলায় এসে জনগণ যে সেবাগুলো পাবেন, আমাদের অফিসগুলোতেও সেভাবে সেবা পাবেন-এটি আমরা সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবো। ধীরে ধীরে আমাদের যে ট্রান্সফরমেশন হচ্ছে, এই ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে সেবা প্রার্থীরা স্বশরীরে হাজিরা থেকে মুক্তি পাবেন-এই স্বপ্ন আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জনবান্ধব ভূমিসেবা নিশ্চিত করা জনগণের দাবী। সেই দাবী বাস্তবায়নে সরকার ও আমরা সরকারী কর্মকর্তারা বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ভূমিসেবা মেলা উদ্বোধন হয়েছে। যে কোন মেলার একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। বাংলাদেশ সরকার ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে মেলার আয়োজন করা হয়েছে সেখানে বর্তমান সময়ের দাবী অনুযায়ী অটোমেটেড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতসহ হয়রানি বন্ধে আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ রয়েছে। আমরা চাই, জনগণের হয়রানি বন্ধ হোক, স্বল্প সময়ে কাঙ্খিত ভূমিসেবা নিশ্চিত হোক। জনগণের দাবী ও আকাঙ্খা অনুযায়ী তাদের প্রত্যাশা পূরণে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিভাগীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নিজেদেরকে আপগ্রেড করতে হবে। প্রযুক্তি মানুষের সৃষ্টি একটি ফর্মুলা। আমরা যেন প্রযুক্তিকে কোনভাবে দূরে ঠেলে না দিই, প্রযুক্তিকে ভয় না পাই। আপনাকে কেউ সহযোগিতা না করলে তা আমরা সনাক্ত করতে পারব, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবো। আগামীতে ভূমি ব্যবস্থাপনায় হয়রানি বন্ধে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে-আমরা এ নিশ্চয়তা দিতে চাই।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, প্রতি বুধবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গণশুনানী হয়। প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা চট্টগ্রাম। ইতোমধ্যে প্রবাসীদের গণশুনানী বাংলাদেশে সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম জেলা থেকে শুরু করি। লন্ডন, কাতার, সৌদিআরব, আরব-আমিরাত ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে চট্টগ্রামের প্রবাসী ভাইয়েরা আছে। আমরা তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারি যে, অধিকাংশ সমস্যাই ভূমি সংক্রান্ত। আমাদের কাছে মানুষ যখন কোন সমস্যা নিয়ে আসে সেখানেও দেখি ভূমি সংক্রান্ত সমস্যাই বেশী। আইন-আদালতের চাপ্টারে দেখলে সেখানেও দেখি ৭০ শতাংশ সমস্যা জায়গা-জমির মামলা মোকদ্দমা সংক্রান্ত । কবরস্থান দখলেরও অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দেশ-বিদেশের সেবা প্রত্যাশীরা যদি তাদের কাঙ্খিত সেবা পায় বা আমরা হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে মনে করবো এ আয়োজন সফল হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে ও বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিফাত বিনতে আরার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ভূমিসেবা মেলা’র অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মোঃ শওকত আলী, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) শারমিন জাহান ও পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃ নাজিমুল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ সাখাওয়াত জামিল সৈকত। অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলোকপাত করেন কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হুছাইন মুহাম্মদ।

অনুষ্ঠানে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেবাগ্রহীতা, প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডয়ার সদস্যবৃন্দ, মানবাধিকারকর্মী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) শারমিন জাহান বলেন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের দোরগোড়ায় সরাসরি ভূমিসেবা পৌঁছে দেওয়াই এই মেলার মূল লক্ষ্য। বর্তমান সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম একটি ক্ষেত্র হল জনবান্ধব ভূমিসেবা জনসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। ভূমি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ভূমি সংক্রান্ত সেবাসমূহ অটোমেশনের মাধ্যমে জনগণের নিকট পৌঁছানোর লক্ষ্যে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ভূমিসেবা ডিজিটালাইজেশন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নাগরিকদের দোরগোড়ায় ভূমিসেবা সহজলভ্য করা, মেলায় নাগরিকদের সরাসরি ভূমিসেবা প্রদান, অনলাইন ভূমিসেবা সিস্টেম ব্যবহারে নাগরিকদের উৎসাহ প্রদান, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদানে নাগরিকদের সহযোগিতা প্রদান এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক সমাধান এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি।

Advertisement