ঢাকার ব্যস্ত সড়কে নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে নারী চালকদের নিয়ে কাজ করছে ‘মায়া রাইড’। ২০২৬ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজ চালুর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৭০ জন নারী বাইক রাইডার। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন নিয়মিত রাইড দিচ্ছেন।
নারীদের গণপরিবহন, সিএনজি কিংবা পুরুষ চালকের রাইড শেয়ারিং ব্যবহারের সময় অস্বস্তি ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই উদ্যোগের ভাবনা আসে ফাহাদ চৌধুরী ও তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের। জান্নাতের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও ঢাকার রাস্তায় নারী বাইক চালকদের দেখে তাদের মাথায় আসে নারী যাত্রীদের জন্য নারী চালকের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিংয়ের ধারণা।
এরপর ফাহাদের উদ্যোগে চালু হয় ‘মায়া রাইড’। শুরুতে মাত্র চারজন নারী চালক যুক্ত হলেও ধীরে ধীরে চালকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে প্রায় ২৫ জন নারী কার চালকও যুক্ত রয়েছেন। তাদের মধ্যে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন চার থেকে পাঁচজন।
মাত্র চার মাসে মায়া রাইডে ৩০০টির বেশি বাইক রাইড হয়েছে। অনেক নারী যাত্রীও নিয়মিত এই সেবা ব্যবহার করছেন। এমনকি কেউ কেউ ৩০ বারেরও বেশি মায়া রাইড নিয়েছেন।
শ্যামলীর বাসিন্দা নুঝাত তাবাসসুম তাদেরই একজন। তিনি ৩০ বারের বেশি মায়া রাইড ব্যবহার করেছেন। তার মতে, অন্যান্য রাইড শেয়ারিংয়ের তুলনায় খরচ কিছুটা বেশি হলেও নারী চালকের কারণে যাতায়াতে নিরাপত্তা ও স্বস্তি পাওয়া যায়।
মায়া রাইডে চালক যুক্ত করার ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা। চালকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ছবি, গাড়ি বা বাইকের নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। নতুন বা কম অভিজ্ঞ চালকদের দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হয় না; সাধারণত এক থেকে দুই বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চালকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
প্রি-বুকিংয়ে কার ও বাইক সেবা
মায়া রাইডের সব সেবাই মূলত প্রি-বুকিং নির্ভর। বাইক রাইডের ক্ষেত্রে আগের দিন রাত ১০টার মধ্যে বুকিং দিতে হয়। রাইডারদের গ্রুপে যাত্রীর রিকোয়েস্ট পাঠানোর পর আগ্রহী চালক পাওয়া গেলে যাত্রীকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
কার সার্ভিসটি মূলত সাপ্তাহিক ও মাসিক সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক। বর্তমানে ‘পিকআপ পয়েন্ট’ ও ‘ডোর টু ডোর’—দুটি প্যাকেজ রয়েছে। পিকআপ পয়েন্ট প্যাকেজের মাসিক খরচ প্রায় ৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং ডোর টু ডোর প্যাকেজের খরচ প্রায় ৯ হাজার ২০০ টাকা।
এ ছাড়া ওয়েবসাইটে থাকা ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে যাত্রার দূরত্ব অনুযায়ী বাইক রাইডের ভাড়া আগে থেকেই জানা যায়।
স্কুলগামী শিশুদের জন্য ‘মায়া কিডস’
নারীদের পাশাপাশি স্কুলগামী শিশুদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্যও চালু হয়েছে ‘মায়া কিডস’। প্রি-বুকিংয়ের মাধ্যমে শিশুদের বাসা থেকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং স্কুল শেষে নিরাপদে বাসায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে শিশুর পরিবারের একজন সদস্যও তার সঙ্গে যেতে পারেন।
বর্তমানে মায়া কিডসের প্রায় সাতজন গ্রাহক রয়েছেন।
নারীদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ
মায়া রাইডের উদ্যোক্তাদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না, বরং নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করছে। নিজেদের বাইক বা গাড়ি থাকা নারীরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারছেন।
নারী চালকদের কাছ থেকে মায়া রাইড কমিশন হিসেবে তাদের আয়ের ১০ শতাংশ নেয়।
তবে নারী চালকের সংখ্যা বাড়ানোই এখন তাদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। চালকের সংখ্যা বাড়লে রাইডের খরচ কমানোর পাশাপাশি আরও বেশি নারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
বর্তমানে ওয়েবসাইটনির্ভর এই কার্যক্রমকে আরও গোছানো করতে একটি অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে অ্যাপটি চালু হতে পারে। সেখানে যাত্রী ও চালক—দুই পক্ষের আলাদা তথ্য, রাইডের রেকর্ড এবং প্রয়োজনীয় সেবা আরও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা করা হবে।
উদ্যোক্তাদের ভাষায়, ‘মায়া রাইড’ শুধু নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি এক নারীকে অন্য নারীর পাশে দাঁড়ানোর একটি উদ্যোগ।

















