বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের বুক চিরে বয়ে গেছে অসংখ্য নদ-নদী, আর এই নদীগুলোর ভাঙা-গড়ার চিরন্তন খেলায় জন্ম নেয় ‘চর’। যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর অববাহিকায় ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান চরাঞ্চল।
সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রাজশাহী, ফরিদপুর থেকে শুরু করে দক্ষিণের ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলের মনপুরা, হাতিয় ধীপ কিংবা চর কুকরি-মুকরির মতো অসংখ্য চরে লাখো মানুষের বসবাস। চরাঞ্চলের এই জীবন যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই ভীষণ কঠিন ও অনিশ্চিত।চরাঞ্চলের মানুষ জন্ম থেকেই এক চরম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বড় হয়, যা তাদের প্রকৃতির সবচেয়ে সেরা ‘কৌশলী যোদ্ধা’ হিসেবে গড়ে তোলে। তাদের এই অতিমাত্রায় কৌশলী ও দূরদর্শী হয়ে ওঠার মূল কারণ হলো জীবনধারণের তীব্র লড়াই ও টিকে থাকার তাগিদ। চরের মানুষের জীবন আজ আছে তো কাল নেই। রাতে যেখানে শান্ত নদী, সকালে সেখানে হয়তো প্রলয়ঙ্করী ভাঙন শুরু হয়ে যায়। এই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে পুরো ঘরবাড়ি ভেঙে অন্য চরে সরিয়ে নেওয়ার অবিশ্বাস্য অভিযোজন ক্ষমতা রপ্ত করে।
প্রকৃতির সাথে এই নিত্য বসবাসের কারণে তারা আধুনিক প্রযুক্তির আগেই নদীর পানির রঙ, বাতাসের গতি বা মেঘের আনাগোনা দেখে বন্যার পূর্বাভাস অনায়াসে বুঝতে পারে। একই সাথে যাতায়াতের তীব্র সংকটের মধ্যেও ঘোড়ার গাড়ি, ট্রলকার, নৌকা কিংবা কাদার ওপর দিয়ে চলাচলের অভিনব সব উপায় তারা বের করে নেয়। চরে সারাবছর একই রকম কাজ থাকে না বলে তারা চরম মাত্রায় বহুমুখী জীবিকায় অভ্যস্ত।
বন্যা এলে তারা যেমন পুরোদস্তুর জেলে বনে যায়, পানি শুকিয়ে গেলে তেমনই দক্ষ কৃষক হয়ে চরের বুকে সোনা ফলায়, আবার কাজের অভাব হলে সহজেই শহরের দিনমজুর হিসেবে খাপ খাইয়ে নেয়। তারা ভালো করেই জানে কখন এবং কীভাবে দুর্যোগের কঠিন দিনগুলোর জন্য সম্পদ ও খাদ্যশস্য সঞ্চয় ও সংরক্ষণ করতে হয়।তবে বাস্তব জীবনের এই কঠিন শিক্ষা ও জীবনমুখী কৌশলগুলো তারা শুধু চরের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে না। এই প্রতিকূলতার পাঠশালা থেকে উঠে এসে চরের কোনো সন্তান যদি কখনো শিক্ষা, পরিশ্রম কিংবা কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে সমাজের মূল স্রোতে নিজের স্থান করে নিতে পারেন, তখন তিনি আর একা থাকেন না। চরের অবর্ণনীয় কষ্টকে খুব কাছ থেকে দেখা সেই মানুষটি তখন হয়ে ওঠেন পুরো চরাঞ্চলের আলোকবর্তিকা। নিজের শিকড়কে ভুলে না গিয়ে তিনি তখন তাঁর অর্জিত ক্ষমতা, মেধা ও অবস্থানকে বিলিয়ে দেন নিজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নে।
একজন চরের মানুষের এই উত্থান ও দূরদর্শিতা তখন হাজারো চরের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলে দেয় এবং বদলে দেয় পুরো অঞ্চলের মানচিত্র।চরাঞ্চলের মানুষের এই কৌশল বা চতুরতা কোনো নেতিবাচক অর্থে নয়, বরং এটি তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অনন্য হাতিয়ার। চরের একেকটি মানুষ যেন একেকটি সুপ্ত সম্ভাবনা, যা সঠিক সুযোগ পেলে প্রকৃতির চরম বৈরিতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুধু নিজেদের চরেরই নয়, বরং পুরো জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। জীবনের গান গেয়ে চলা সেই অদম্য, সাহসী ও রূপান্তরকামী মানুষদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

















