পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই নিয়োগ

৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডারের সন্ধান

515

পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশ ছাড়াই প্রশাসনের বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরি পেয়েছেন অন্তত ৯৫ জন। জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ হওয়া এই ৯৫ ‘ভুয়া বিসিএস ক্যাডার’ বছরের পর বছর আঁকড়ে আছেন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই তাদের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটও। ৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডারের মধ্যে বেশিরভাগই নিয়োগ পেয়েছেন প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে। ভয়াবহ এ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত ২৯, ৩০ ও ৩১তম বিসিএস নিয়োগে।

Advertisement

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালিয়ে ৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডারকে চিহ্নিত করেছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় এরই মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সংস্থাটি। অনুসন্ধান চলছে আরও শতাধিক ক্যাডারের বিষয়ে।

দুদকের অনুসন্ধান বলছে, সরকারের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি একটি বিধিবদ্ধ প্রবিধান আদেশ (এসআরও) জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই আদেশের মাধ্যমেই প্রশস্ত হয় নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের পথ। মেধাতালিকায় পিছিয়ে থাকা প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাও ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ ওই প্রার্থীদের মধ্যে অনেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্য আবেদনও করেননি। নিয়োগ নিশ্চিতের জন্য তাদের নামে ভুয়া সনদ তৈরির প্রমাণও পেয়েছে দুদক।

নিজস্ব অনুসন্ধানে ৯৫ ভুয়া ক্যাডারের মধ্যে ৬৮ জনের বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণ হাতে পেয়েছে গণমাধ্যম। সেসব তথ্যে দেখা গেছে, নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তার মধ্যে বেশিরভাগই মেধাতালিকায় অনেক পিছিয়ে ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই নিজেদের প্রার্থীদের সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু মেধাতালিকায় পিছিয়ে থাকা প্রার্থীদের প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জে পড়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ‘Age, Qualification and Examination for Direct Recruitment Rules-1982’ সংশোধন করে একটি এসআরও জারি করে। সংশোধিত এসআরও অনুযায়ী, পিএসসির সুপারিশকৃত প্রার্থীদের মধ্য থেকে মেডিকেলে অনুপস্থিত প্রার্থীদের স্থানে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থেকে নিয়োগ দেওয়া যাবে। তবে নির্বাচন ও সুপারিশের ক্ষেত্রে নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ২০১২ সালের ওই এসআরও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত ২৮তম বিসিএস থেকে পরবর্তী সকল পরীক্ষার ক্ষেত্রে কার্যকরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর এ আইন কাজে লাগিয়ে পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই নন-ক্যাডার থেকে প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেই এবং কোটায় আবেদন করেননি এমন অনেককেও ভুয়া সনদ বানিয়ে নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের নির্দেশনা, পরামর্শ ও নেতৃত্বে অনিয়মের এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। মূলত ২৯, ৩০ ও ৩১ বিসিএসে এ আইনের প্রয়োগ ঘটায় আওয়ামী লীগ সরকার। পুরো পক্রিয়া সম্পন্ন করেন এইচটি ইমাম। এ জন্য এই তিন বিসিএস ‘এইচটি ইমাম বিসিএস‘ নামে পরিচিত! 

গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২৯ বিসিএসে পিএসসির সুপারিশে ২০১১ সালের ১০ জুলাই ১৪৮০ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেয় তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। এ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ১৩ মাস পরে ২০১২ সালের ১২ আগস্ট আরও ২১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে এ বিসিএসে নিয়োগ পান আরও ৮ জন। এই ২৯ প্রার্থীর মধ্যে কাউকে নিয়োগের ব্যাপারে পিএসসির কোনো সুপারিশ ছিল না। একই প্রক্রিয়ায় ৩০তম বিসিএসে ৩১ জন এবং ৩১তম বিসিএসে ৩৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তিন বিসিএসে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ৯৫ ভুয়া ক্যাডার পরবর্তী সময়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে চাকরি করেছেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এই ৯৫ ভুয়া ক্যাডারের মধ্যে ৬৮ জনের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য হাতে পেয়েছে গণমাধ্যম ।

২৯ বিসিএসে ২৯ ‘ভুয়া ক্যাডার’

২৯তম বিসিএসে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ২৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৭ জনের তালিকা এসেছে গণমাধ্যমের হাতে। তালিকা পর্যালোচনা করে জানা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদে নিয়োগ পেয়েছেন পাঁচজন। তারা হলেন- সাজিয়া আফরীন (রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৪২০২৪২, মেধাক্রম ১৯৪তম), আসমাউল হুসনা লিজা (০১৯৩০২/১৯৫), মোছা. নাসরীন পারভীন (০৭৪৩১৭/১৯৬), সুলতানা রাজিয়া (০১৭৮৬৭/ ১৯৭), মমতাজ বেগম (০৬০০১৪/ ১৯৮)।

পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন দুজন- আছাদুজ্জামান (০২২০৭৬/ ৩৭) ও মাহফুজা আক্তার শিমুল (০৪৫৬৭৬/ ৩৯)। আনসার ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন শামীম আহমেদ (০৬৩২৬১/ ১৪)।

শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন চারজন- অষ্পড়া বড়ুয়া (০৭৯৭৪৫/ ৭০), ফরিদা ইয়াসমীন (০৩৭৪৩৮/ ৭১), ফাহমিদা মাহজাবিন (০২৮৮২৬/ ৭২) ও রোখসানা খাতুন (২১৮৪২৫/ ৭৩)। ইকোনমিক ক্যাডারে সহকারী প্রধান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত দুজন হলেন মিফতা-উল-জান্নাহ (০৪১১৮৬/ ৪২) ও ফারহানা রহমান (০৪১২৬১/ ৪৩)।

কর ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন তিনজন। তারা হলেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম (০৬০৯৬৭/ ২৯), কামরুন নাহার শম্পা (০১৯১০৩/ ৩০) ও মোসাম্মদ মাকসুদা ইসলাম (০৬০৩৫৬/ ৩২)।

পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন দুজন। তারা হলেন- জামাল আল নাসের (০০০০৯৬/ ১১) ও মোহাম্মদ কায়সার খসরু (৩১৩৬২২/ ১৩)। পররাষ্ট্র ক্যাডারে রয়েছেন সুভানা ইকরাম চৌধুরী (০২০৭৪৬/ ১৬) । এ ছাড়া সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন এ টি এম কামরুজ্জামান (১৩২৮২১/ ৬৮)।

এ ছাড়া এই বিসিএসে অনিয়মের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া আরও ছয় ভুয়া ক্যাডারকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির দায়ে মামলা করেছে দুদক।

দুদকের জালে ছয়জন

২৯তম বিসিএস পরীক্ষার সব নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষের পর নতুন করে ছয়জন প্রার্থীকে অবৈধভাবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় প্রশাসন, পুলিশ, পরিবার পরিকল্পনা ও সাধারণ শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এসব প্রার্থীরা কোটায় আবেদন না করলেও জাল ও নকল মুক্তিযোদ্ধা সনদ বানিয়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর ওই ছয় ভুয়া ক্যাডারের বিরুদ্ধে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মামলা করেছে দুদক। তারা হলেন- প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) উপসচিব রকিবুর রহমান খান, জামালপুর জোনের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার ও উপসচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন এবং বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের উপসচিব নাহিদা বারিক। মামলা হওয়া অপর তিন কর্মকর্তা হলেন- এপিবিএনের পুলিশ সুপার খোরশেদ আলম (পুলিশ ক্যাডার), চুয়াডাঙ্গার জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সহকারী পরিচালক হালিমা খাতুন (পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডার) ও ঝিনাইদহের সরকারি কেশব চন্দ্র কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. মিল্টন আলী বিশ্বাস (সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার)।

দুদকের অনুসন্ধানে এসেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে পরস্পর যোগসাজশে ২৯তম বিসিএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রায় ছয় মাস পর ছয়জন প্রার্থীকে অবৈধভাবে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের কোটায় প্রশাসন, পুলিশ, পরিবার পরিকল্পনা ও সাধারণ শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই ছয়জনকে নিয়ম ভেঙে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকায় উল্লিখিত ছয় ভুয়া ক্যাডারের পাশাপাশি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান/সদস্য, সাবেক সচিব, সাবেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার), মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাসহ আরও ১৫ জনের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে দুদক।

৩০ বিসিএসেও অনিয়ম

২০১২ সালে ১৭ মে ৩০তম বিসিএসে ২২৬১ জন প্রার্থীকে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রায় ৫ মাস পরে পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই নিয়োগ পান আরও ১৯ জন। এরপর বিভিন্ন সময়ে সুপারিশ ছাড়া আরও নিয়োগ দেওয়া হয়। অনুসন্ধান বলছে, ৩০তম বিসিএসে সব মিলিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে ৩১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনের তালিকা পেয়েছে গণমাধ্যম।

তালিকা ঘেঁটে দেখা যায় ভুয়া ক্যাডারদের মধ্যে প্রশাসনে নিয়োগ পেয়েছেন চারজন। তারা হলেন নাসরিন আক্তার (৪০৫১২৬/ ২৮৫), রুবাইয়াৎ ফেরদৌসী (০৭৪৭৯৫/ ২৮৬), সূবর্ণা রানী সাহা (২১০২৭৬/ ২৮৭), পারভীন সুলতানা (০৬৯৭৬২/ ২৮৮)। পুলিশ ক্যাডারে রয়েছেন দুইজন- মোছা. সুলতানা রাজিয়া (০৭৩৫৯৫/ ১৯২) ও শামিমা নাসরিন (০০৮৫০৭/ ১৯৩)। আনসার ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন দুইজন। তারা হলেন হোসনে আরা হাসি (০১৪৪১৩/ ৪৫) ও মৌসুমী আক্তার (৩১০৭৭৬/ ৪৬)। তাদের মধ্যে মৌসুমী আক্তার আগেই চাকরি ছেড়েছেন।

দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডারে সহকারী মহা-হিসাবরক্ষক পদে। তারা হলেন পাপিয়া মনোয়ারা (০৯৬২৭৬/ ৪৩) ও শমীলা নাজনীন (০৬৮৪৫১/ ৪৪)। শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন জোবায়দা খানম (০৫৯৯৮১/ ৫৩)

৩০ বিসিএসে অনিয়মের মাধ্যমে পরিবার ও পরিকল্পনা ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া তিনজন হলেন ইন্দ্রানী দেবনাথ (০৫২৪২৯/ ২০), সাহেদা হোসেন (৩০৫২০৪/ ২১) ও কাজী মমতাজ বেগম ০৫৬০৮২/ ২২)।

এ ছাড়া তথ্য ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন ৪ জন। তারা হলেন শামীমা ইয়াসমিন স্মৃতি (০৮১৪৭৭/ ১৭), উম্মে ফারহানা হোসেন শিমু (০২৫৯৫৩/ ১৮), সাহিদা মঞ্জুরী (০৮২০৮৯/ ১৯) এবং জিন্নাত আরজু মুক্তা (০০৯৯৯৬/৫)। তাদের মধ্যে শামিমা ইয়াসমিন স্মৃতি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।

৩১ বিসিএসে অনিয়ম সবচেয়ে বেশি

২০১২ সালের ২৭ ডিসেম্বর ৩১তম বিসিএসে চূড়ান্ত নিয়োগ পান ১৮১২ প্রার্থী। পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষে পরের বছরের ১২ জুন আরও ২৩ জন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর সংশোধিত এসআরও কাজে লাগিয়ে ৩১ বিসিএসে আরও ১২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এই বিসিএসে পিএসসির সুপারিশ ছাড়া চাকরি পান অন্তত ৩৫ জন। তাদের মধ্যে ২৩ জনের তালিকা পেয়েছে গণমাধ্যম।

সেই তালিকা মোতাবেক ৩১ বিসিএসে অনিয়মের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রশাসন ক্যাডারে, ১১ জনকে। তারা হলেন এইচ এম সালাউদ্দিন মনজু (০৪৩০১৭/ ২৪০), এস এমসাদি তানভীর (০৫২১২৫/ ২৪১), সাঈকা সাহাদাত (০২২৪১৩/ ২৪২), এ কে এম হেদায়েতুল ইসলাম (০১০৮৭৬/ ২৪৩), সোহেল রানা (০৫৯১৯৭/ ২৪৪), মোছা. আকতারুন নেছা (২২১৩০৪/ ২৪৫), সুপ্রিয়া চৌধুরী (০৫৯৬৬০/ ২৪৬), মোহাম্মদ রেজাউল করিম (০৭২৬৬৬/ ২৪৯ ), শিরীন আক্তার (০০৯৭৩৫/ ২৫১), মোছা. রওনক জাহান (০০৯৭৩৫/ ২৫২) এবং মাহফুজা সুলতানা (০১০২০০/ ২৫৩)।

পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া ছয়জন হলেন থান্দার খায়রুল হাসান (০৪২৪৬৫/ ১৬৬), মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন (০৪০৪০৬/ ১৭১), আমরীন খাইরুল (০৭৩০২৩/ ১৮৪), মো. শরিফুল আলম (০২৬৬৩৭/ ১৯১), মাহবুবুল হক সজীব (০১৮৭৩০/ ১৯২) ও সুদীপ দাস (৬২৯২৮২/ ১৯৪)।

ইকোনমিক ক্যাডারে আছেন তিনজন- মো. সাইফুল ইসলাম (০৪৪০৬৮/ ৩৪), মোহাম্মদ তারেক হাওলাদার (০৮৫০৪৫/ ৩৫) ও মো. ফজলুর রহমান (০৪৩২২৫/ ৩৬)।

এ ছাড়া তথ্য ক্যাডারে মাসুম উল্লাহ (০২২৫৯২/ ৩৩), পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (১০৪৯৭৮/ ৫৪), কর ক্যাডারে মো. রকিবুর হাফিজ (০৯২৯২৪/ ৫০) নামে একজন নিয়োগ পেয়েছেন।

অভিযোগ মানতে নারাজ অভিযুক্তরা

অভিযোগের বিষয়ে জানতে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় ২৯ বিসিএসের মমতাজ বেগমের সঙ্গে (০৬০০১৪/১৯৮)। দুদকের চিহ্নিত করা ২৯ ভুয়া ক্যাডারের মধ্যে তিনিও একজন। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা হয় তার সঙ্গে।

অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমাদের নিয়োগে বিন্দু পরিমাণ রাজনৈতিক প্রভাব নেই, সেটি মেধার ভিত্তিতেই হয়েছে। তবে আলাপের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন অভিযুক্তদের অনেকে আবেদনে মুক্তিযোদ্ধা কোটা উল্লেখ না করলেও কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন। মমতাজ আরও বলেন, ‘চাকরিতে আসা থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত আমাদের ভেতরেরই অনেক মানুষ আমাকে অনেকভাবে ডিসটার্ব করেছে। এখনও কিছু মানুষ সুযোগ বুঝে আমাকে খামচি দিয়ে ধরার চেষ্টা করছে।’

অভিযুক্তদের মধ্যে আরও কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দুদকের জালে আরও ভুয়া ক্যাডার

বিসিএসে নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তবে বিষয়টি নিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে রাজি হননি। জানতে চাইলে কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ২৯ থেকে ৩১ পর্যন্ত ৩টি বিসিএসে প্রায় শতাধিক প্রার্থীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। এসব প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে তৎকালীন সরকার একটি এসআরও জারি করে এই নিয়োগকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া অনেক প্রার্থীদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ বানিয়ে ভুয়া সনদে জারিকৃত ওই এসআরওর অধীনে নিয়োগ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যেই এমন ৬ জন ক্যাডারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। ইতোমধ্যেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের হাতে এসেছে।

নিয়ম না মেনে বিসিএসে নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আকলাপকালে দুদক কমিশনার মিয়া আলী আকবর আজিজি বলেন, কয়েকটি বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুযোগ নিয়ে অমুক্তিযোদ্ধার পোষ্যরা নিয়োগ নিয়েছে। কমিশনের তদন্তে তা প্রমাণিত হলে মামলা হবে। তখন নিয়ম অনুযায়ী যারা এ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি করছেন তাদের শাস্তি হবে।

কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

নিয়ম ভেঙে সিভিল সার্ভিসে নিয়োগের বিষয়টিকে জাতীয় চরিত্র অবক্ষয়ের নির্লজ্জ উদাহরণ বলে আখ্যায়িত করেন সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, এ ঘটনা আমাদের চরম দুর্ভাগ্য এবং জাতীয় চরিত্র অবক্ষয়ের একটি নির্লজ্জ উদাহরণ। যারা এভাবে নিয়োগ নিয়েছে এবং এটা যদি প্রমাণিত হয় তবে তাদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ কখনো এ রকম চিন্তা না করতে পারে। এটাতে ছাড় দেওয়া বা নমনীয়ভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, যারা বিচার করে, মোবাইল কোর্ট করে, সরকারের প্রতিনিধিত্ব করে তারাই যদি এমন প্রতারণা করে তাহলে তাদের কাছ থেকে কী ভালো কাজ আশা করা যায়। তাদের শাস্তি নিশ্চিত হলে পরে এমন কাজের পুনরাবৃত্তি করতে আর কেউ সাহস পাবে না।

পিএসসির সুপারিশ ছাড়াই নিয়োগের এ প্রক্রিয়া নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মূল অভিযোগটা অবশ্যই প্রতারণামূলক। কোনো দিক থেকে যারা যোগ্য নয় এমন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এভাবে সরকারি খাতে নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। সে সময় এটি মোটামুটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তার মানে এই নয় যে এ নিয়োগ মেনে নিতে হবে।

তিরি আরও বলেন, কী প্রক্রিয়ায় তারা সুবিধাটা পেল এবং এর সঙ্গে অবৈধ লেনদেনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে। এ অবৈধ ও প্রতারণামূলক নিয়োগে জড়িতদের মধ্যে নিয়োগ কর্তৃপক্ষ এবং যারা সুবিধা নিয়েছে উভয়কেই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিএসসির সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার গণমাধ্যমকে বলেন, ৯৫ ভুয়া বিসিএস ক্যাডার শনাক্তের বিষয়ে দুদক থেকে অফিসিয়ালি কোনো তথ্য এখনও আমাদের কাছে আসেনি। যদি এমন কিছু হয়ে থাকে এবং কারও বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তে এমন তথ্য প্রমাণিত হয়, তবে সেই পরীক্ষার্থী ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি-বিধান অনুযায়ী অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Advertisement