প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্বব্যাপি পালিত হয় বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের হুমকি হিসেবে নির্মূল করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র লক্ষ্য বাস্তবায়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
এ বছর বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের প্রতিপাদ্য ‘হেপাটাইটিস: লেটস ব্রেক ইট ডাউন’, যা মূলত হেপাটাইটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে আর্থিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলার একটি আহ্বান। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো দেশে এই রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসার সব উপকরণ হাতের নাগালে থাকলেও, সাধারণ জনগণের অবহেলা, সচেতনতার অভাব ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অসংখ্য মানুষ এখনো এর প্রকোপ থেকে অনিরাপদ রয়ে গেছে। তাই সমাধানগুলো কাজে লাগানোর এখনই সময়, এখনই সময় জানার!
হেপাটাইটিস মূলত লিভারের একটি রোগ, যা পাঁচ ধরনের ভাইরাসের (এ, বি, সি, ডি, ই) মাধ্যমে হতে পারে। হেপাটাইটিস এ এবং ই সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায়, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদী হয়।
অন্যদিকে, হেপাটাইটিস বি, সি এবং ডি রক্ত বা শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে ছড়ায়, যা দীর্ঘমেয়াদী বা ক্রনিক আকার ধারণ করতে পারে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে এগুলো লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মতো জটিলতার কারণ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মতে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ ক্রনিক হেপাটাইটিস বি অথবা সি নিয়ে বসবাস করছিলেন এবং উক্ত বছর এদের সংক্রমণে প্রায় ১৩ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হেপাটাইটিস হলো হেপাটাইটিস বি, যাকে সাধারণ মানুষ জন্ডিস হিসেবে চিনে থাকে। যদিও, কেবল হেপাটাইটিস বি এর কারণেই জন্ডিস হয় বিষয়টি তা নয়। এর বৈশ্বিক প্রকোপ গড়ে ৩.৫ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা প্রায় ৪ শতাংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার প্রায় ০.৭ শতাংশ। তবে, ২০০৩ সাল থেকে নবজাতকদের টিকাদান কর্মসূচি চালুর ফলে ২০১৯ সালে পাঁচ বা এর কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে টিকাদান ও স্ক্রিনিং সুবিধা এখনো সীমিত।
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য মনে করিয়ে দেয় যে, হেপাটাইটিস পরীক্ষা ও চিকিৎসা প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই আমাদের হাতে আছে। কার্যকর ভ্যাকসিন, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা পদ্ধতি এবং হেপাটাইটিস সি’র ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য চিকিৎসাও আছে। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এসব সেবা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করা। বাংলাদেশে অনেকেই অবহেলা বা ভুল ধারণার কারণে রোগ পরীক্ষা করান না। আবার অনেকের কাছে নিয়মিত স্ক্রিনিং করানোর মতো তথ্য বা সুযোগ থাকে না। এই বাধাগুলো দূর করতে সচেতনতামূলক প্রচারণা, সহজলভ্য পরীক্ষা কেন্দ্র এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার সাথে হেপাটাইটিস স্ক্রিনিংকে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
ধরনভেদে হেপাটাইটিসের উপসর্গ কিছুটা মিলে গেলেও সময়কাল ও তীব্রতায় পার্থক্য থাকে। যেমন; হেপাটাইটিস এ-তে সাধারণত জ্বর, ক্লান্তি, বমি ভাব, পেট ব্যথা, খাবারে অরুচি এবং পরে জন্ডিস (চোখ-ত্বক হলুদ হওয়া) দেখা দেয়। তবে এটি সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়। হেপাটাইটিস বি-এর প্রাথমিক পর্যায়ে কোন উপসর্গ থাকে না বললেই চলে। তবে ক্লান্তি, জয়েন্টে ব্যথা, পেটে অস্বস্তি, গাঢ় রঙের প্রস্রাব ও জন্ডিস দেখা দিতে পারে। হেপাটাইটিস সি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কোন উপসর্গ ছাড়াই বেঁচে থেকে একটা সময় পর লিভার ক্ষতিগ্রস্ত করে। তখন ক্লান্তি, পেট ব্যথা ও জন্ডিসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। হেপাটাইটিস ডি শুধু হেপাটাইটিস বি আক্রান্তদেরই হয়, যা সাধারণত হেপাটাইটিস বি-এর উপসর্গগুলোকেই আরও তীব্র করে ও দ্রুত লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়। হেপাটাইটিস ই অনেকটা হেপাটাইটিস এ-এর মতো। এক্ষেত্রে জ্বর, বমি ভাব, পেট ব্যথা ও জন্ডিসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি বাড়তি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রামবাসীদের জন্য এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি ও হেপাটোলজি বিভাগে হেপাটাইটিস বি এবং সি রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং, পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী ও উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা হয়। অভিজ্ঞ হেপাটোলজিস্ট, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টদের তত্ত্বাবধানে আধুনিক ল্যাবরেটরি ও ইমেজিং সুবিধার মাধ্যমে রোগীদের লিভারের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়, যা প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই হেপাটাইটিসের উপসর্গগুলো দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করাই উত্তম।
লেখকঃ
ডা. এস. এম. সোহেল রানা
অ্যাটেন্ডিং কনসালটেন্ট, গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি ও হেপাটোলজি
এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম

















