সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া মাদক নির্মূল সম্ভব নয়: চট্টগ্রামের ডিসি

66

শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে পরিবার ও সমাজের সব স্তর থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। বিবেকবান মানুষের নীরবতা সমাজকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।

Advertisement

আজ ( ২৫ শে আগস্ট) মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের ভাটেরখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন। ‘মাদকমুক্ত সমাজ, আমাদের অঙ্গীকার’ স্লোগানে উপজেলা প্রশাসন এ সমাবেশের আয়োজন করে।

মাদকের বিস্তার সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখনই মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের কোনো সন্তান মাদক গ্রহণ করুক, তা হতে দেওয়া যায় না।’

মাদককে সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের ওপরই নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। তিনি কখন খুন, চুরি বা ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়বেন, তা আগে থেকে বলা যায় না। সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে হবে।

মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধারা যেভাবে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা যেভাবে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের দাবিতে দাঁড়িয়েছিলেন, একইভাবে সমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

মাদক নিয়ন্ত্রণে জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রশাসনিক অভিযান ও আইনের প্রয়োগ অব্যাহত থাকবে। মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে প্রশাসনকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তথ্য দিন, আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব। মাদকের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।’

তবে শুধু প্রশাসনিক অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ে সোচ্চার হতে হবে। শুধু শিক্ষিত ও সম্মানিত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সচেতন নাগরিকদের প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে।

অভিভাবকদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, সন্তানকে শুধু সনদ কিংবা ভালো ফলের জন্য প্রস্তুত করলে হবে না; তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যে সন্তান বাবা-মাকে সম্মান করে না, ছোটদের ভালোবাসে না এবং অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে না, তার শিক্ষাগত সাফল্য পরিবার বা সমাজের কাজে আসে না।

শিক্ষার্থীদের সময় কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সময় কিনতে পাওয়া যায় না। বিশ্বে টিকে থাকতে হলে মেধা ও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। মাদকের পেছনে সময় নষ্ট করলে যোগ্যতা অর্জন কিংবা সুস্থভাবে চিন্তা করা সম্ভব হবে না।’

শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের সামনে আদর্শ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপনের আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, শুধু মাদক থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিলে হবে না। অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এমনভাবে চলতে হবে, যাতে তাঁদের দেখে তরুণেরা অনুপ্রাণিত হয়।

মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, মাদকের প্রতি সামাজিক ঘৃণা তৈরির পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। এসব মূল্যবোধ কিনতে পাওয়া যায় না; নিজের মধ্যে ধারণ করে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হয়।

বড় অনুষ্ঠান, সাউন্ডবক্স বা প্যান্ডেল দিয়ে কোনো এলাকাকে মাদকমুক্ত করা যাবে না উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, মুরাদপুরে কোনো মাদকসেবী বা মাদক ব্যবসায়ী না থাকলেই এ আয়োজন সফল হবে। সমাজ শুধু প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের নয়, এটি সবার। প্রত্যেকে দায়িত্ব পালন করলে নিরাপদ, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম, ভাটেরখীল উচ্চবিদ্যালয়ের সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এজহারুল ইসলাম, সমাজসেবক মো. শহিদুল ইসলাম ও ছাত্র প্রতিনিধি সাজ্জাদ সাকিল।

এর আগে সীতাকুণ্ড উপজেলা পরিষদের সম্মেলনকক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন জেলা প্রশাসক। সেখানে তিনি সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে জনভোগান্তি কমিয়ে সরকারি সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।

পরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সামাজিক অনুদান, হুইলচেয়ার, গাছের চারা, শিক্ষা ও ক্রীড়াসামগ্রী, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপকরণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বেঞ্চ বিতরণ করা হয়।

সফরের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসক সীতাকুণ্ড মডেল থানা, অস্ত্রাগার ও উপজেলা ভূমি কার্যালয় পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সেবাপ্রার্থীদের দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

Advertisement