সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ফিরছে ভর্তি পরীক্ষা
প্রথম শ্রেণিতে লটারি, দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষায় ভর্তি
মোঃ তৌহিদুল ইসলাম || চট্টলা নিউজ
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তিতে আবারও ফিরছে লিখিত পরীক্ষা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রথম শ্রেণিতে ডিজিটাল লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হলেও দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শূন্য আসনে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। এ লক্ষ্যে ‘সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা-২০২৭’ প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রকাশিত নতুন নীতিমালায় ভর্তি পরীক্ষার নম্বর বণ্টন, সময়, আবেদন ফি, আসন সংরক্ষণ এবং ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনার পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তিতে প্রচলিত লটারি পদ্ধতির পরিবর্তে পরীক্ষাভিত্তিক মেধা মূল্যায়ন কার্যকর হচ্ছে।
শ্রেণিভেদে পরীক্ষার নম্বর ও সময় নির্ধারণ
নীতিমালা অনুযায়ী, দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার পূর্ণমান হবে ৫০। এর মধ্যে বাংলায় ১৫, ইংরেজিতে ১৫ এবং গণিতে ২০ নম্বর বরাদ্দ থাকবে। পরীক্ষার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে এক ঘণ্টা।
অন্যদিকে, ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার পূর্ণমান হবে ১০০। এ ক্ষেত্রে বাংলায় ৩০, ইংরেজিতে ৩০ এবং গণিতে ৪০ নম্বর থাকবে। পরীক্ষার সময় হবে দুই ঘণ্টা।
প্রশ্নপত্র জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যবই অনুসরণ করে তৈরি করতে হবে। প্রশ্নপত্র শ্রেণি উপযোগী ও মানসম্মত রাখার নির্দেশনাও রয়েছে নীতিমালায়।
প্রথম শ্রেণিতে থাকছে ডিজিটাল লটারি
প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে আগের মতোই ডিজিটাল লটারি পদ্ধতি বহাল রাখা হয়েছে। এ শ্রেণিতে কেন্দ্রীয়ভাবে লটারি পরিচালনা করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। একজন আবেদনকারী সর্বোচ্চ পাঁচটি বিদ্যালয় পছন্দক্রম অনুযায়ী নির্বাচন করতে পারবেন। তবে দ্বৈত শিফটের কোনো বিদ্যালয়ের উভয় শিফট পছন্দ করলে তা দুটি পছন্দ হিসেবে গণ্য হবে।
লটারি কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সফটওয়্যারের যথার্থতা সরকার স্বীকৃত অন্য একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই করানোর নির্দেশনা রয়েছে। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের তালিকা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং নোটিশ বোর্ডে টানিয়ে দিতে হবে।
নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শূন্য আসনের সমানসংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে অপেক্ষমাণ তালিকা প্রস্তুত রাখতে হবে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচিত কেউ ভর্তি না হলে অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে পর্যায়ক্রমে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে।
আবেদন ফি সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা
নতুন নীতিমালায় প্রথম শ্রেণিতে অনলাইন আবেদনের ফি সর্বোচ্চ ১১০ টাকা এবং দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণির জন্য সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেশন চার্জসহ ভর্তি ফি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে নির্ধারণ করতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণি শাখায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ৫৫ জন। শূন্য আসনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
নির্দিষ্ট শ্রেণি ও এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আসন
ঢাকা মহানগরীর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের আওতাধীন এলাকার (ক্যাচমেন্ট এরিয়া) শিক্ষার্থীদের জন্য ৪০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকবে। অবশিষ্ট ৬০ শতাংশ আসন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
এ ছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণিতে মোট আসনের ১০ শতাংশ স্বতন্ত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। নীতিমালায় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তান, সহোদর-সহোদরা এবং যমজ ভাই-বোনদের জন্যও নির্ধারিত হারে আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
অনলাইনে সম্পন্ন হবে ভর্তি কার্যক্রম
নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির আবেদন গ্রহণ, ফি পরিশোধ, ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ ও প্রকাশের কার্যক্রম অনলাইনে সম্পন্ন হবে। ফলে আবেদন থেকে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত ভর্তি প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হবে।
তবে ভর্তি পরীক্ষা ও আবেদন শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করতে হবে।
মেধা যাচাইয়ের সুযোগ, বাড়তে পারে প্রস্তুতির চাপ
ভর্তি পরীক্ষায় ফিরে যাওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও প্রস্তুতির ভিত্তিতে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল ও মেধাক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির চাপ, কোচিংনির্ভরতা এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থানের শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র শ্রেণি উপযোগী রাখা, মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম প্রতিরোধ করা হবে নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সব মিলিয়ে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আসছে। প্রথম শ্রেণিতে লটারি বহাল থাকলেও দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচনের সিদ্ধান্তের ফলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই সংশ্লিষ্ট শ্রেণির পাঠ্যবইভিত্তিক প্রস্তুতি এবং সরকারি ভর্তি বিজ্ঞপ্তির দিকে নজর রাখতে হবে।

















