মূলধারার গণমাধ্যমের নাম, লোগো ও নকশা ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে অপতথ্য। এসব ফটোকার্ডে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে ভুয়া উদ্ধৃতি ও বক্তব্য, যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এতে ব্যক্তিগত সম্মানহানি, সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও বিভিন্ন অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিরা। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশি-বিদেশি ৭৫টি সংবাদমাধ্যমের নাম, লোগো ও নকশা নকল করে ৬৮৭টি ঘটনায় ৭৪৪টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন দুটির বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই হার ৪৭ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে দৈনিক আমার দেশ, যমুনা টিভি ও দৈনিক কালের কণ্ঠের নাম। এ তিনটি গণমাধ্যমের নামে যথাক্রমে ১০৬, ৮৯ ও ৭৮টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
কাদের নিয়ে ছড়াচ্ছে অপতথ্য
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে নিয়ে ২৭৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এরপর রয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তাকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে ২১২টি ভুল তথ্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে ১০৯টি অপতথ্য।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আ ফ ম খালিদ হোসেন, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ফরিদা আখতার, মো. তৌহিদ হোসেন, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, সি আর আবরার, শেখ বশিরউদ্দীন, ফারুক-ই-আজম, বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, ড. আলী রীয়াজ, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মাহফুজ আলম ও নাহিদ ইসলামকে নিয়েও ভুল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারকে জড়িয়েও ভুল তথ্য পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের বাইরেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, খেলোয়াড় ও বিনোদন জগতের ব্যক্তিদের নিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জড়িয়ে ৪৯২টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীকে নিয়ে ২১৯টি এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে নিয়ে ৬৯টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। পুলিশকে নিয়ে ছড়ানো হয়েছে ১৩৩টি ভুল তথ্য। এ ছাড়া বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, র্যাব, বিজিবি ও আনসারকে নিয়েও ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ক্রীড়াঙ্গন ও বিনোদন জগতের পরিচিত ব্যক্তিরাও বাদ যাচ্ছেন না। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে ১৫টি, তামিম ইকবালকে নিয়ে ১০টি এবং হামজা চৌধুরীকে নিয়ে সাতটি ভুল তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বিনোদন জগতের সাদিয়া আয়মানকে নিয়ে ১৬টি, পরীমণি ও তাসনিয়া ফারিণকে নিয়ে ১১টি করে এবং আজমেরী হক বাঁধনকে নিয়ে নয়টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
যেভাবে শনাক্ত হয় ভুয়া ফটোকার্ড
রিউমর স্ক্যানার জানায়, কোনো ফটোকার্ড ভুয়া কি না, তা যাচাই করতে প্রথমে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের মূল ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলে সেটি প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফন্টের অমিল, তারিখের গরমিল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে ছবি তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন শামা ওবায়েদকে নিয়ে তৈরি একটি ফটোকার্ডের অংশ গুগল জেমিনির ভেরিফাই এআই টুলে পরীক্ষা করে এআই দিয়ে তৈরি বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
ভুয়া ফটোকার্ডে বিড়ম্বনা
ভুয়া ফটোকার্ডের কারণে ব্যক্তির সম্মানহানি হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে গুজব ছড়ানোর অপচেষ্টা শনাক্ত করেছে বাংলাফ্যাক্ট। একইভাবে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের নামে যমুনা টিভির লোগো ব্যবহার করে ভুয়া মন্তব্য জুড়ে একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হচ্ছে, যা যমুনা টিভি কখনো প্রকাশ করেনি।
প্রথম আলো, সমকাল, ইনডিপেনডেন্ট টিভি, যমুনা টিভি ও এখন টিভির মতো গণমাধ্যমের নাম ও নকশা ব্যবহার করেও ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হচ্ছে। পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হচ্ছে, ফটোকার্ডটি তাদের প্রকাশিত নয়।
অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের নাম ও ছবি ব্যবহার করে নারীদের নিয়ে কিংবা রাজনৈতিক উসকানিমূলক বক্তব্যসংবলিত ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করা হচ্ছে। এসব ফটোকার্ড ভাইরাল হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে বিব্রতকর পরিস্থিতি ও সামাজিক হেনস্তার মুখে পড়তে হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি লেখা পড়তে দুই মিনিট লাগলেও ফটোকার্ডের বক্তব্য বুঝতে লাগে মাত্র দুই সেকেন্ড। এ কারণে ফটোকার্ড দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন।
সাংবাদিক ও কলামিস্ট মাসুদ কামাল বলেন, “এমন একটা বিষয়, যেটা আমি বলিনি, সেটা আমার নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে যে সমস্যাটা হয়, মনে করেন, চার-পাঁচ দিন পরে অথবা আমি যখন বিষয়টি দেখি; সবকিছু তো আর আমি দেখি না; তখন হয়তো প্রতিবাদ করি, আবার অনেক সময় করিও না। কিন্তু কার কাছে প্রতিবাদ করবো? প্রতিবাদ করার মতো কোনো কর্তৃপক্ষ তো নেই। যদি কোনো কর্তৃপক্ষ থাকতো, তাহলে তাকে বলতে পারতাম, ‘আপনি তো আমার কথা প্রকাশ করেছেন, কিন্তু আমি এ কথা বলিনি।’ কিন্তু এখানে এ ধরনের কেউ নেই।”
তিনি বলেন, এসব ভুয়া ফটোকার্ড দেখে মানুষের মধ্যে তার সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়। এ ধরনের ফটোকার্ডের মাধ্যমে মানুষ অপমানিত ও বিব্রত হন। অনেক সময় সামাজিক অস্থিতিশীলতাও তৈরি হয়।
নিজের নামেও বহু ভুয়া ফটোকার্ড প্রকাশিত হয়েছে জানিয়ে মাসুদ কামাল বলেন, “আমার নামে এ রকম বহু ভুয়া ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়েছে। বড় বড় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেও এসব ফটোকার্ড ছাপা হয়েছে। আমি তাদের ফোন দিয়েছি। তারা বলেছে, ‘ভাই, না, এটা তো আমরা করিনি।’ কিন্তু কে করেছে, তা-ও তারা বলতে পারে না। শুধু বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কখনও এআই দিয়ে বানানো হচ্ছে, আবার অনেক সময় নিজেরাও বানিয়ে দিচ্ছে।”
এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে খুবই খারাপ প্রবণতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি মনে করি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানুষের জীবনকে খুবই দুর্বিষহ করে তোলে। মানুষকে বিভ্রান্ত করে, মানুষের চিন্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপনকে পরবর্তী সময়ে অসহনীয় করে তোলে।”
দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী তৈরির তাগিদ
ভুয়া ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহমেদ বলেন, সমস্যার মূল জায়গায় নজর দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে অনেক সময় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মূল সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে সমস্যাগুলো থেকেই যায়।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল করে তোলা প্রয়োজন। এ জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং কীভাবে দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী তৈরি করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে।
অধ্যাপক আবুল মনসুর আহমেদ বলেন, কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে ব্যবহারকারীর ভাবা উচিত, সেটি শেয়ার করা ঠিক হবে কি না। কোনো ভুয়া ফটোকার্ড শেয়ার বা তাতে লাইক দেওয়ার আগেও যাচাই করা প্রয়োজন, তথ্যটি সঠিক কি না। সেটি শেয়ার বা ফরওয়ার্ড করলে কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে কি না, তা বিবেচনায় নিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ ধরনের দায়িত্বশীলতা আছে কি না, তা দেখতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী তৈরিতে এখন পর্যন্ত কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে এ ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশে কয়েক হাজার অনলাইন পোর্টাল থাকলেও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে মাত্র তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার পোর্টাল নিবন্ধনের আওতায় এসেছে বলে জানান এই অধ্যাপক। অর্থাৎ অনেক পোর্টালই নিবন্ধনের বাইরে রয়েছে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভুয়া তথ্য ছড়ানোর পর সেটি অনলাইন পোর্টালেও সংবাদ হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে। মিথ্যা তথ্য, গুজব ও ভুয়া ফটোকার্ডের ওপর ভিত্তি করে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, যা হওয়া উচিত নয়।
অধ্যাপক আবুল মনসুর আহমেদ বলেন, অনেক আগেই একটি সম্প্রচার আইন হওয়ার কথা ছিল। সেই আইনের আওতায় সম্প্রচার কমিশন গঠনেরও কথা ছিল। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টালসহ সংশ্লিষ্ট মাধ্যমগুলো এ কমিশনের নজরদারিতে থাকার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা হয়নি। তাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলার উপায় খুঁজতে হবে।
অপতথ্য ঠেকাতে করণীয়
ভুয়া ফটোকার্ড ও অপতথ্য প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এসব কাজ করেন, তাদের নীতিবোধ জাগ্রত হবে—এমন প্রত্যাশা করে লাভ নেই। সরকারের উচিত, ভুয়া ফটোকার্ড প্রকাশের পর যে উৎস থেকে সেটি আপলোড করা হয়েছে, তা খুঁজে বের করা। কেউ শেয়ার করলেও তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। কারণ, তিনি কেন সেটি শেয়ার করবেন, তার জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
এ ধরনের দু-একটি ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হয়তো প্রবণতাটি বন্ধ হতো বলে মনে করেন তিনি। তা না হলে সমাজে অস্থিরতা তৈরি হবে।
মাসুদ কামাল বলেন, “প্রতিকারের একমাত্র উপায় হলো, এ ধরনের ফটোকার্ড পাওয়া গেলে সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। অথবা যে প্রতিষ্ঠানের নামে ফটোকার্ডটি প্রকাশ করা হয়, তাদেরও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”
কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশনের নামে ভুয়া ফটোকার্ড প্রকাশিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও বিষয়টি স্পষ্ট করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি জানাতে পারে, তাদের নামে একটি ভুয়া ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়েছে, অথচ তারা সেটি প্রকাশ করেনি এবং এর দায়দায়িত্বও তাদের নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী তৈরির বিষয়ে অধ্যাপক ড. আবুল মনসুর আহমেদ বলেন, মানুষকে সচেতন করতে হবে। গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বা বুলেটিনের মতো করে প্রচার চালাতে হবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারেন যে ভুয়া তথ্য শেয়ার করা উচিত নয়। কেউ এ ধরনের তথ্য শেয়ার করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, সেটিও জানাতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা রয়েছে কি না, তা দেখতে হবে। কোন ধরনের তথ্য শেয়ার করা যাবে আর কোন ধরনের তথ্য শেয়ার করা যাবে না, সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। বিষয়গুলো জানানো গেলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে দায়িত্বশীলতা তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে সিম বিক্রির ক্ষেত্রে আরও কঠোর হতে হবে, যাতে কেউ ইচ্ছেমতো একাধিক সিম ব্যবহার করতে না পারেন। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা গেলে সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব। “আমি বলব না, এটি অসম্ভব।”
অধ্যাপক আবুল মনসুর আহমেদ বলেন, প্রতিটি জেলা শহরে তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অফিস রয়েছে। সেখানকার তথ্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে গ্রামগঞ্জের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। রাজধানীতে সচেতনতামূলক প্রচারের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণযোগাযোগ অধিদপ্তর রয়েছে। এই অধিদপ্তর শিল্পীদের দিয়ে গান ও অন্যান্য প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে রাস্তার মোড়ে মোড়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে পারে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। কারণ, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। এআই ও চ্যাটবট ব্যবহার করে এখন অনেক কিছু তৈরি করা যায়, অনেক কিছু কৃত্রিমভাবে বানানো সম্ভব। তাই এসব বিষয় নিয়ে এখনই চিন্তা করার উপযুক্ত সময়।
সাইবার আইন নিয়ে পরামর্শ চলছে: আইনমন্ত্রী
ভুয়া তথ্য ও এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে সরকার।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সাইবার আইন নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ চলছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি এবং এআই ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত করার বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনের ভাষা ও বিধান কী হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে নানা মতামত আসছে। এসব মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জাতীয় সংসদে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, “এখনও এটা একটা ‘র’ স্টেজে আছে, প্রাইমারি স্টেজে আছে। আমরা এখনও এটা ফাইনাল ড্রাফটিংয়ের স্টেজে যাইনি।”
তিনি বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এআইয়ের ব্যবহার মানুষের জীবনকে সহজ করছে। তবে এর অপব্যবহার নতুন উদ্বেগও তৈরি করছে। এআই দিয়ে তৈরি বা বিকৃত ছবি, ভিডিও কিংবা অন্যান্য কনটেন্টের মাধ্যমে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা, সম্মানহানি ঘটানো কিংবা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে ক্ষতি করার আশঙ্কা রয়েছে।
সাইবার আইন নিয়ে চলমান জনপরামর্শে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে যেভাবে হয়রানি করা হচ্ছে এবং এআই ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে, তা প্রতিরোধে আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন।
এর আগে নিজের বক্তব্য বিকৃত করে একটি জাতীয় দৈনিকে ফটোকার্ড প্রকাশের উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গত ২৮ এপ্রিল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “আমরা আসলে ফটোকার্ড নিয়ে শক্ত অবস্থানে যাবো। আমরা ডিসইনফরমেশন বেসড ফটোকার্ড আসলে অ্যালাউ করবো না।”

















