নিজস্ব প্রতিবেদন, চট্টলা নিউজ ডেস্কঃ চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে প্রচার-প্রচারণা, মাইকিং, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করেছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়, জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর এসব উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের গত ১২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৪৬ জনে। একই সময়ে জেলায় ডেঙ্গুতে ২৪ জনের মৃত্যুর তথ্য জানানো হয়। ওই দিন ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।
স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগ
ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আক্রান্ত রোগীদের তথ্য সংগ্রহ, চিকিৎসাসেবার সমন্বয় এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, লিফলেট বিতরণ এবং এডিস মশার প্রজননস্থল সম্পর্কে নাগরিকদের সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নগরীর আটটি এলাকাকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করার তথ্য জানানো হয়। এসব এলাকার মধ্যে জালালাবাদ, পাঁচলাইশ, উত্তর কাট্টলী, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, দক্ষিণ হালিশহর ও দক্ষিণ পতেঙ্গা রয়েছে। একই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপ ও মশার লার্ভা শনাক্তের বিষয়ও উঠে আসে।
জেলা প্রশাসনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান
ডেঙ্গু প্রতিরোধে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ স্লোগানে গত ২৫ জুলাই থেকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর আওতায় সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জলাশয় ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে।
১২ সেপ্টেম্বর থেকে জেলাজুড়ে তিন মাসব্যাপী বিশেষ ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রায় দুই হাজার মসজিদ ও আশপাশের এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এ কর্মসূচিতে পরিচ্ছন্নতাকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
এ ছাড়া সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলীর পর হাটহাজারীতেও মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেন জেলা প্রশাসক। ১০ অক্টোবর হাটহাজারী পৌরসভা ও উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ১৫টি চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সেখানে ফগিংয়ের পাশাপাশি এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রম
নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম, ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ, মশার প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
গত ৬ অক্টোবর নগরীর রহাত্তারপুল এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, শুধু সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এ জন্য নাগরিকদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
এ ছাড়া নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ওষুধ প্রয়োগ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
নাগরিকদের সচেতনতাই বড় ভরসা
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু ওষুধ ছিটানো যথেষ্ট নয়; এডিস মশার প্রজননস্থল নির্মূল করাও জরুরি। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পানির পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবন ও আশপাশের স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। অন্তত তিন দিন পরপর জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সমন্বিত কার্যক্রম ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সুফল ধরে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি ও জনসম্পৃক্ততা। তাই প্রশ্ন থেকেই যায় প্রশাসনের প্রচার-প্রচারণা ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি নিজেদের বাসাবাড়ি ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখতে কতটা সচেতন হচ্ছেন চট্টগ্রামের নাগরিকেরা?

















