সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকায় কেনা হচ্ছে পুলিশের গাড়ি

24

পুলিশের অপারেশনাল কাজে সক্ষমতা বাড়াতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন ধরনের ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানা, ৭৩টি হাইওয়ে থানা ও ২৪টি রেলওয়ে থানাসহ মোট ৭৩৬ থানার অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল করতে এ গাড়ি কেনা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশের কার্যক্রমের গতিশীলতা আনতে রায়ট কন্ট্রোল ভেহিক্যাল ও অল ট্রেইন ভেহিক্যাল (এটিভি)সহ বিশেষায়িত গাড়িও কেনা হচ্ছে। যুগের পর যুগ ধরে পুলিশের গাড়ি সংকটের সমাধানে বিপুল অঙ্কের টাকায় এ গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

Advertisement

পুলিশ সূত্র জানায়, ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ এবং ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ নামে দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে এই গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম প্রকল্পটিতে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ ৪৭ হাজার হাজার টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন কেনা হচ্ছে। দ্বিতীয় প্রকল্পে ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা ব্যয়ে ১০০১টি বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্প দুটির প্রস্তাবনা পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ হয়ে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। দুটি প্রকল্পই আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করার কথা রয়েছে। একনেকে প্রকল্প দুটি পাস হলে ২০২৯ সালের মধ্যেই প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন হবে এবং প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী তা চলতি মাস থেকেই শুরু হবে।

প্রকল্প দুটির নথি থেকে দেখা যায়, দুটি প্রকল্পই সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্প দুটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর গত ১৫ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) প্রস্তাব দুটি পর্যালোচনা করে। কমিটি সুপারিশ করেছে, এই প্রকল্পগুলোতে যেন সঠিক ব্যয় প্রাক্কলন নিশ্চিত করা হয়, সরকারি ক্রয় বিধিমালা মেনে চলা হয় এবং গাড়িগুলোর পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা রাখা হয়। পাশাপাশি পুলিশের অনুমোদিত যানবাহনের তালিকায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় আনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। পরে প্রকল্প দুটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে।

অপারেশনাল যানবাহন ক্রয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশে জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীন ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানা, ২৪টি রেলওয়ে থানা এবং ৭৩টি হাইওয়ে থানা সংশ্লিষ্ট এলাকায় সেবা প্রদান করছে। তবে বর্তমানে থানাগুলোতে গড়ে দুটিরও কম যানবাহন রয়েছে। একটি থানায় মাত্র এক বা দুটি গাড়ি থাকলে কোনো একটি দল অভিযানে গেলে থানার অন্যান্য এলাকায় টহল ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণ পরিস্থিতিতে প্রতিটি থানায় ন্যূনতম ৪ থেকে ৫টি পিকআপ বা টহলযান থাকলে একই সময়ে থানার বিভিন্ন এলাকায় কার্যকরভাবে টহল চালানো সম্ভব হবে। অধিক জনবহুল, ব্যস্ত ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে আরও বেশি যানবাহনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে বর্তমানে ৬৩৯টি থানা মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি যানবাহন রয়েছে। এর মাধ্যমে ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় টহলসহ অন্যান্য কার্যক্রম চালাতে হয় পুলিশকে। বিদ্যমান এই যানবাহনের মধ্যে ৬৪ শতাংশ যানবাহন ১০ বছরের অধিক পুরোনো।

প্রস্তাবনায় বলা হয়, একটি আধুনিক ও দক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক যানবাহনের কোন বিকল্প নেই। গাড়ি ঘাটতি ও যেসব গাড়ি রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেশ পুরোনো হওয়ায় অনেক সময় সফলভাবে অভিযান চালানো কষ্টকর হয়ে যায়। মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম গতিশীল ও অপরাধ দমনে দ্রুত সাড়া প্রদান নিশ্চিতকরণে যানবাহন ঘাটতি পূরণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের যানবাহন ক্রয় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ যা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। জনশৃঙ্খলাসহ অপরাধ দমন পরিস্থিতিতে বা জরুরি অবস্থায় টহল গাড়ি অনেক দ্রুত ও কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অপরাধীকে ধরতে ও প্রমাণ রক্ষা করতে পর্যাপ্ত গাড়ি প্রয়োজন। সন্ত্রাস দমন, মাদক উদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান চালাতে পর্যাপ্ত বাহনের দরকার।

অপারেশনাল কাজে পুলিশের গাড়ি কেনার প্রস্তাবে আরও বলা হয়, জাতীয় নির্বাচন বা বড় কোনো ইভেন্টে দেশের সব থানায় একযোগে অতিরিক্ত যানবাহনের প্রয়োজন হয়, ঘাটতি থাকলে তা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে বিভিন্ন ধরনের অপারেশনাল যানবাহনের যে ঘাটতি রয়েছে তা মেটানো না গেলে সার্বিক জনসেবা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, প্রস্তাবটি একনেকে পাস হলে পুলিশের অপারেশনাল কাজের জন্য চার হাজার ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন ধরনের চার হাজার ৮২৯ গাড়ি কেনা হবে। এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ফি হিসেবে ৪৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ৯৫০ জনকে ড্রাইভিং অ্যান্ড মেকানিকস প্রশিক্ষণে (হালকা ও ভারী) এক কোটি ১৪ লাখ টাকা এবং ৫০ জন ভেহিক্যাল মেকানিককে প্রশিক্ষণে ৩৯ লাখ টাকা ব্যয় হবে। পাশাপাশি যানবাহন মেরামতের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি ক্রয়েও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তর সূত্র জানায়, এই প্রকল্পের আওতায় নৌপথে সংঘটিত বা নৌপথ ব্যবহার করে পরিচালিত যেকোনো বড় ধরনের হুমকি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অথবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নদীপথে নিয়মিত টহল, অপরাধী গ্রেপ্তার, জাটকা নিধন প্রতিরোধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত উদ্ধার ও সহায়তা দেওয়াসহ কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তা জোরদারে স্পিডবোট ও কান্ট্রি বোট কেনা হবে।

এদিকে ১০০১টি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একটি আধুনিক ও দক্ষ পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য বিশেষায়িত যানবাহনের কোন বিকল্প নেই। এই ধরনের যানবাহন কেনা একটি কৌশলগত পদক্ষেপ যা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। বিশেষায়িত যানবাহন পুলিশের কার্যক্রমের গতিশীলতা নিশ্চিত করে। জনশৃঙ্খলাসহ অপরাধ দমন পরিস্থিতিতে বা জরুরি অবস্থায় সাধারণ টহল গাড়ির চেয়ে রায়ট কন্ট্রোল অনেক দ্রুত এবং কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে। এ ছাড়া দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অপরাধ দমনে সাধারণ যানবাহনের সমীবদ্ধতা থাকলেও বিশেষায়িত অল ট্রেইন ভেহিক্যাল (এটিভি) সহজেই প্রবেশ করতে পারে। এ ধরনের যানবাহনগুলো পুলিশকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে। মোবাইল কমান্ড সেন্টার অপারেশন চালানোর সময় একটি ভ্রাম্যমান কন্ট্রোল রুম হিসেবে কাজ করে। এই ধরনের গাড়িতে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ক্রাইম সিন ভ্যান অপরাধস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রমাণ ও আলামত সংগ্রহের জন্য। এটা তদন্ত প্রক্রিয়াকে সহজ ও অপরাধী শনাক্ত করতে সহায়তা করে।

একটি আধুনিক, দক্ষ এবং জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন বিশেষায়িত যানবাহন অপরিহার্য উল্লেখ করে প্রস্তাবনায় বলা হয়, জনসমক্ষে এ ধরনের আধুনিক যানবাহনের উপস্থিতি বাহিনীর সক্ষমতার একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটিতে ১০০১ টি বিশেষায়িত গাড়ি কিনতে ২ হাজার ২২৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের বাকি অর্থ ড্রাইভিং অ্যান্ড মেকানিকস প্রশিক্ষণ, ভেহিক্যাল মেকানিক প্রশিক্ষণ ও রেজিস্ট্রেশনে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের অপারেশনালসহ নানা কাজেই যানবাহন সংকট দীর্ঘদিনের। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সংকট আরও বড় সমস্যা সৃষ্টি করে। এতে কাঙ্ক্ষিত পুলিশি সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। এসবের বাইরে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ৪৫৫ গাড়ি পোড়ানোসহ ১ হাজার ৭৪টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে বাহিনীর পরিবহন সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

Advertisement