বিপিসির ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণের মধ্যেই বেসরকারি উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক

অনুমোদনহীন প্ল্যান্টে হেভি ক্রুড আমদানি করতে চায় সুপার পেট্রোকেমিক্যাল

জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

29

নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি কোনো অনুমোদন না থাকা এবং দফায় দফায় চালুর আবেদন নাকচ হওয়ার পরও ভারী অপরিশোধিত তেল (হেভি ক্রুড) আমদানির অনুমতি পেতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দ্বারস্থ হয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। রাষ্ট্রীয় একমাত্র জ্বালানি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্প (ইআরএল-২) যখন পিএমসি নিয়োগের মাধ্যমে এগোচ্ছে, ঠিক তখনই অনুমোদনহীন এই বেসরকারি প্ল্যান্টের জন্য কাঁচামাল আমদানির তৎপরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

Advertisement

হাতে আসা নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর বিপিসির চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষের জন্য ৪ লাখ টন লাইট ক্রুড এবং ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চান। অথচ এর মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে, গত ১৪ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল তাদের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টটি মূলত লাইট ক্রুড পরিশোধন উপযোগী।

চিঠিতে কৌশলের আশ্রয় ও স্ববিরোধিতা
২৭ অক্টোবরের চিঠিতে বিপিসির ১০ আগস্টের একটি চাহিদাপত্রের সূত্র উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, ২০২৭ সালে তারা বিপিসিকে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টন অকটেন, ১ লাখ ১৯ হাজার টন পেট্রোল, ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টন ডিজেল এবং ৩ লাখ ৬১ হাজার টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) সরবরাহ করবে। এই সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার যুক্তি দেখিয়েই মোট ১২ লাখ টন ক্রুড আমদানির অনুমতি চাওয়া হয়।

এর আগে ১২ আগস্ট বিপিসিকে দেওয়া আরেক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা জানান, তাদের নির্মাণাধীন দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতার ‘ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট’ (সিডিইউ) ২০২৭ সালের মার্চে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সরকারি নথিপত্রে এই রিফাইনারি স্থাপনের কোনো বৈধ অনুমোদনের তথ্য মেলেনি।
কনডেনসেট ও লাইট ক্রুডের বিভ্রান্তি

চিঠিপত্রে লাইট ক্রুডের পাশে ব্র্যাকেটে ‘কনডেনসেট’ লিখে দুটি ভিন্ন পণ্যকে একই হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এটিকে কারিগরি বিভ্রান্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক একজন মহাব্যবস্থাপক জানান, বিপিসি কখনোই কনডেনসেটকে লাইট ক্রুড হিসেবে গণ্য করে না। কনডেনসেট মূলত গ্যাসক্ষেত্রের উপজাত (বাই-প্রোডাক্ট), আর ক্রুড অয়েল সম্পূর্ণ পেট্রোলিয়াম পণ্য।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য ও ভূতত্ত্ববিদ মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, “কনডেনসেট ও লাইট ক্রুড এক নয়। কনডেনসেট আসে গ্যাসক্ষেত্র থেকে এবং লাইট ক্রুড আসে তেলক্ষেত্র থেকে। যদিও দুটোই প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি তৈরি হয়, কিন্তু আমদানি ও কারিগরি মানদণ্ডে এগুলোর প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।”

জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, “জ্বালানি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় পণ্য। সরকারি বৈধ অনুমোদন ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে রিফাইনারি নির্মাণ সরাসরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে। অনুমোদনহীন এমন কার্যক্রম আইনত দণ্ডনীয় এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা উচিত।”

এদিকে আমদানি আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম জানান, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের চিঠিটি তাদের নজরে এসেছে এবং বিপিসির কারিগরি টিম সেটি পর্যালোচনা করছে। তবে অনুমোদনহীন একটি প্ল্যান্ট কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণাধীন রয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য এড়িয়ে যান।

উল্লেখ্য, বর্তমানে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল তাদের ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির ন্যাফতা এবং দেশি-বিদেশি কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে বিপিসিকে পরিশোধিত তেল সরবরাহ করে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি বিপিসিকে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭ টন বিভিন্ন গ্রেডের জ্বালানি পণ্য সরবরাহ করেছে। তবে বিদ্যমান ফ্রাকশনেশন সুবিধার আড়ালে এবার পূর্ণাঙ্গ রিফাইনারি না থাকা সত্ত্বেও হেভি ও লাইট ক্রুড আমদানির সুযোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হলো।

Advertisement