রোগীকে ‘ঘুঘুর ফাঁদ’ দেখাচ্ছে দালাল চক্র

109

যেন রোগী ভাগানোর এক মচ্ছব! ফন্দি এঁটে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে রোগী পাঠানো, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের জন্য ফার্মেসি– সবই ‘নির্ধারিত’। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পা ফেললে রোগীকে দেখতে হয় এমন ‘ঘুঘুর ফাঁদ’। এ ফাঁদ তৈরি করে রেখেছে শতাধিক দালাল। শুধু পুরুষ নয়, রোগীর ‘মন ভোলাতে’ আছে নারী দালালও। চট্টগ্রাম অঞ্চলের দরিদ্র ও অসহায় রোগী এবং তাদের স্বজনকে নানা প্রতিশ্রুতির চোরাবালিতে ফেলে এ চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। অনেক সময় দালালদের খামখেয়ালিপনায় মরণাপন্ন হয়ে পড়ছে রোগী। দিনের পর দিন হাসপাতালজুড়ে এমন দালালকাণ্ড চললেও যেন দেখার কেউ নেই। অভিযোগ রয়েছে, মূল কুশীলবকে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপও নিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

Advertisement

খোঁজখবর নিয়ে চমেক হাসপাতাল ঘিরে শতাধিক দালালের সক্রিয় উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যাদের বেশির ভাগের বয়স ২০ থেকে ৪০। চমেকের চারপাশের শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসি এসব দালালকে পালছে। রোগী ভাগানোর ওপর দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে কমিশন ঢোকে দালালের পকেটে। দালালদের ‘প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাব’ তৈরি করতে দেওয়া হয় লোভনীয় টাকার প্রস্তাব। যেসব বিভাগে রোগীর আধিক্য, অস্ত্রোপচারের জন্য বেশি টাকার প্রয়োজন হয়– রোগী ভাগাতে সেখানেই থাকে দালালদের চতুর চোখ।

রোগীকে ফাঁদে ফেলতে দুপুরের পরের সময়টি দালালদের বেশ পছন্দের। কারণ ওই সময় হাসপাতাল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাশূন্য হয়ে পড়ে। আইসিইউ ওয়ার্ড থেকে একজন রোগী ভাগিয়ে নিতে পারলেই দালালের হাতে চলে আসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা।

হাসপাতালে রোগীর ভাগ্যে জোটে না ওষুধ। হরহামেশা হয় চুরি। হুটহাট নষ্ট হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ রোগ নির্ণয় যন্ত্র। ওষুধ চুরিসহ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত খোদ হাসপাতালের কর্মী-নার্স। অনিয়ম-হয়রানির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় গত দেড় বছরে অন্তত ১৫ কর্মীকে পুলিশে দেওয়া হয়। তবু কমেনি অরাজকতা।

হাসপাতাল ঘিরে শতাধিক দালাল

হাসপাতালটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের দরিদ্র ও অসহায় রোগীর একমাত্র ভরসার চিকিৎসা কেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকে তিন হাজারের বেশি। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন আরও কয়েক হাজার। এত রোগীতে গমগম করায় দালালদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে হাসপাতালটি।

ওয়ার্ড ভাগ করে পালা করে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সক্রিয় থাকে দালালরা। রোগী ও তাদের স্বজনকে ফাঁদে ফেলতে সক্ষম– এমন তরুণ দালালদের মাঠে দায়িত্ব দেয় নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান। সক্রিয় থাকা দালালদের নামও পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে জুয়েল ইফতেখার শাওন, আলাউদ্দিন মাসুদ, মো. দুলাল, সজীব হাওলাদার, মো. শামীম, ওমর ফারুক, শাহাদাত হোসেন, নাজিম উদ্দিন, রাজীব বৈদ্য, মো. রাজু, এনায়েত মোর্শেদ, সোহেল রানা, শুভ দাস, মোরশেদ আলম, ইমতিয়াজ আহমেদ, মো. ইমন, আরাফাতুল ইসলাম, নূর হোসেন, মহসিন সরকার, শফিউল বশর, ইরফানুল আলম, ইমন সরকার, জয় ধর, মো. জুয়েল, মো. সুমন, মইন উদ্দিন, আলম বাবু, মো. সবুজ, রয়েল দে, মো. জিসান, আদনান সিকদার, মো. ফরহাদ, মোরশেদ আলম, মো. সফিক, সাহাব উদ্দিন, নূর হোসেন, মো. মহসিন, শফিউল বশর, মোহাম্মদ ফরহাদ, মো. মোমিন, ইকবাল মিয়া, বাদল দাস, মো. সালাউদ্দিন, রাসেল হোসেন ও আবু জাফরের নাম উল্লেখযোগ্য। রোগী ভাগিয়ে নেওয়া ও হয়রানি করার সময় এদের অনেককেই একাধিকবার হাতেনাতে আটক করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ।

সক্রিয় নারী দালালও

পুরুষ দালালরা প্রশাসনের নজরদারিতে থাকায় কৌশল হিসেবে নারী দালালদের হাতে নিয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান। তাদের মধ্যে রয়েছেন– মমতাজ বেগম, রুমা আক্তার, রিতা চৌধুরী, আলো দাস, লায়লা নাসরিন, রশিদা বেগম, রেশমা আক্তার, রুপা বেগম, শাকিলা বেগম, বিলকিস আরা, আক্তার বেগমসহ অনেকে। জানা গেছে, নারী দালালের সর্দার রিতা চৌধুরী। তিনি প্রতিদিন পরিস্থিতি বুঝে নারীদের ওয়ার্ডভিত্তিক দায়িত্ব ভাগ করে দেন। হাসপাতালের প্রধান ফটক ও পূর্ব গেটে তিনি দু’জনকে দায়িত্ব দেন। বাকিরা পালা করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে হাসপাতালের গাইনি, সার্জারি, অর্থোপেডিকসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে।

আইসিইউর রোগী মানে ছক্কা!

আইসিইউ থেকে এক রোগী ভাগিয়ে আনতে পারলেই মেলে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা! এ কারণে ভুয়া ডাক্তার ঢুকিয়েও রোগী ভাগানোর চেষ্টা করে দালালচক্র। এমনই এক ঘটনা ঘটেছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি। রোগী ভাগিয়ে নিতে ডাক্তার সেজে চমেক হাসপাতালের আইসিইউতে ঢোকেন তৈয়ব আলী পাটোয়ারী। তাঁর পরনে ছিল ডাক্তারের অ্যাপ্রোন। অথচ তিনি বেসরকারি চিটাগং ল্যাব লিমিটেডের টেকনিশিয়ান। মোটা অঙ্কের টাকার প্রস্তাব পেয়ে ভুয়া ডাক্তার সেজে আইসিইউ থেকে রোগী ভাগাতে এসেছিলেন তিনি। পরে হাতেনাতে আটক করে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

নজর বেশি গাইনি ওয়ার্ডে

দালালদের অর্ধেকের বেশি সক্রিয় থাকে বিশেষ এই ওয়ার্ডে। এখানে ভর্তির পর রোগীর একসঙ্গে ১৫ থেকে ২০ রকমের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর প্রয়োজন হয়। তবে সব ওষুধ একসঙ্গে কোথায় পাওয়া যাবে– সে বিষয়ে অন্ধকারে থাকেন বেশির ভাগ রোগী ও স্বজন। এ সুযোগ কাজে লাগায় দালালরা। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের লম্বা ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ওয়ার্ড থেকে কেউ বের হলেই দালালচক্র পেছনে ছোটে। স্বজনের হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে নেয় ওষুধের তালিকা। পরে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়।

প্রতিদিন হাওয়া ৩০-৪০ রোগী

দালালদের চক্করে পড়ে রোগী উধাও হওয়ার ঘটনা এখানে নিত্যদিনের। অনেকে রোগীর খোঁজ পেতে থানায় করেন সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। এমন ঘটনা সরকারি হাসপাতালে নিরাপত্তার ঘাটতির বড় প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশিষ্টজন।

হাসপাতালের আইসিইউসহ চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী ‘উধাও’ হয়ে যায়। হাসপাতালের কয়েক মাসের তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতিদিন রেকর্ড সংখ্যক রোগী উধাও হয়ে যাওয়ার মতো তথ্য পেয়েছে সমকাল। এর নেপথ্যেও রয়েছে দালালচক্র। অর্থোপেডিক ও সার্জারি ওয়ার্ড থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ জনের বেশি রোগী উধাও হয়ে যায়।

সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত রোগী

চমেক হাসপাতালে ইসিজি করতে খরচ হয় মাত্র ৮০ টাকা, যা বেসরকারিতে পড়ে ২৫০-৩০০ টাকা। মাত্র ২ হাজার ৫০০ টাকায় সিটি স্ক্যান, এমআরআইয়ের মতো বড় পরীক্ষাগুলো করার সুযোগ রয়েছে। অথচ এসব পরীক্ষা বেসরকারিতে করতে গুনতে হয় ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা। এভাবে বেসরকারির চেয়ে ৭০ শতাংশের কম দরে প্রায় অর্ধশত পরীক্ষা করার সুযোগ রয়েছে চমেক হাসপাতালে। তবে দালালদের চক্করে পড়ে সরকারি সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগী।

ওষুধ জোটে না রোগীর ভাগ্যে

চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্রে দামি ওষুধের নাম না লিখলেও স্টোর থেকে ঠিকই সেসব ওষুধ উধাও হয়ে যায়। তবে তা পৌঁছায় না ওয়ার্ডে কিংবা রোগীর কাছে। ওষুধ উধাও হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ওয়ার্ড বয়-নার্স ও কর্মচারীরা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হটলাইনে পাওয়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১১ জানুয়ারি অভিযান চালায় দুদক সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-১-এর একটি দল। তারা রোগীর ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের নাম উল্লেখ না থাকলেও সেই ওষুধ স্টোর থেকে ওঠানোর প্রমাণ পান নার্সের রেজিস্ট্রার খাতায়। প্রতিটি শয্যায় রোগী পর্যন্ত ওষুধ না পৌঁছানোরও প্রমাণ পায় দুদক।

যন্ত্র হুটহাট বিকল

সবচেয়ে বেশি জরুরি সিটি স্ক্যান ও এমআরআই যন্ত্র দুটি দুই বছরে অন্তত দশবার বিকল হয়েছে। একবার নষ্ট হলে তা অচল থাকে মাসের পর মাস। এ ছাড়া এনজিওগ্রাম, ম্যামোগ্রাফি, ক্যাথল্যাব, ব্র্যাকি থেরাপি, কোলনস্কপিসহ অধিকাংশ মেশিন নষ্ট থাকে বেশির ভাগ সময়। এতে দরিদ্র-অসহায় রোগীদের কম টাকায় পরীক্ষা করা থেকে হতে হয় বঞ্চিত।

কারা কী বলছেন

এ ব্যাপারে দুদকের সহকারী পরিচালক এনামুল হক বলেন, ‘এই হাসপাতালে দালালের উৎপাত সবচেয়ে বেশি। এখানে রোগীদের সরকারি ওষুধ সরবরাহ না করে আত্মসাৎ করা হয়। ওষুধ নিয়ে নয়ছয়ের প্রমাণ একাধিকবার পেয়েছি আমরা। এর নেপথ্যে রয়েছে হাসপাতালের নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয় ও কিছু কর্মচারী। দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্র নষ্ট থাকে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে ভূরিভূরি অনিয়ম, ভোগান্তি-হয়রানির প্রমাণ পেয়েছি।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘দরিদ্র-অসহায় রোগীদের একমাত্র ভরসার হাসপাতালেও যদি চিকিৎসাসেবা না মেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? সরকারি বিনামূল্যের নানা সামগ্রীও রোগীদের কপালে জোটে না। দালালের মাধ্যমে অনেক রোগী উধাও হয়ে যায়। এটি ভয়াবহ ঘটনা। কারও সহযোগিতা না নেওয়া ছাড়া তো দালালরা হাসপাতালে ঢুকছে না।’

পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক বলেন, ‘দালাল ধরার পর দেশের প্রচলিত আইনে এ অপরাধের নির্দিষ্ট ধারা না থাকায় মামলা করার সুযোগ থাকে না। শুধু অভিযোগ দাখিল করে আদালতে পাঠানো হয়।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান বলেন, ‘দালাল চক্রের অত্যাচারে সবাই ত্যক্তবিরক্ত। তাদের কারণে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রোগী। হাসপাতালের চারপাশে থাকা বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসি দালালদের পালে। অনেক সময় আইসিইউ থেকেও রোগী উধাও হয়ে যায়।’ এক প্রশ্নের জবাবে শামীম আহসান বলেন, ‘এত সংখ্যক মানুষের সার্বিক বিষয় তদারকিতে বাড়তি জনবলের প্রয়োজন। আমাদের হাতেগোনা কয়েকজন আনসার রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে জনবল বাড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছি। হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তার, নার্স ও আনসার সদস্য রোগীকে অন্যত্র পাঠানোর প্রক্রিয়ায় জড়িত।’

Advertisement